আহমেদ লাট সাহেব (দা.বা.)
২০১৪ টঙ্গি ইজতেমা (১ম পর্ব) বাদ মাগরিব বয়ান
হযরত মাওলানা আহমেদ লাট সাহেব (দা.বা.)
আল্লাহ তায়ালার হামদ, রাসূলুল্লাহ (স:) এর উপর দুরূদ, পবিত্র কুরআন শরীফের আয়াত এবং হাদীসে পাক থেকে তেলাওয়াতের পরে হযরত মাওলানা বলছেন-
কাবেলে এহতেরাম ভাইয়ো দোস্ত আযিযো আওর বুযুর্গো!
আল্লাহ জাল্লা জালালুহু আম্মা নাওয়ালুহু প্রত্যেক যামানায় মানুষকে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়েছেন। যে, হে মানুষ, আমাকে চিনো, আমি কে? এমনকি যে সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম ও রুসুলে এজাম আলাইহিমুস সালাতু ওয়া তাসলিমাত কে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তাঁর বান্দা বান্দিদের রাহবারির জন্য, হেদায়েতের জন্য, রাস্তা দেখাবার জন্য, কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ তা বুঝানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাদেরকেও সর্বপ্রথম তাঁর সাথে পরিচয় করিয়েছেন।
আজকে সারা দুনিয়াতে মানুষ বলছে আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি। অথচ আল্লাহ জাল্লা জালালুহু আম্মা নাওয়ালুহু পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, অর্থাৎ-জেনে রেখো, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।
কিসের আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি? জানার বিষয় হলো এটা, যা তোমাকে জানতে হবে তা এই জানো যে, আল্লাহ- তিনি ছাড়া আর কেউ কিছু নয়। বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন রাস্তায় আল্লাহ তাআলা নবী রাসূল গণকে তার সাথে পরিচয় করিয়েছেন। কখনো মুর্দাকে জীবিত করে দিয়ে। কখনো সাপকে লাঠি বানিয়ে, লাঠিকে সাপ বানিয়ে, আবাবিলের মাধ্যমে তাঁর সাহায্যকে পাঠিয়ে, কখনো কোন কওমকে জমিনে ধ্বসিয়ে দিয়ে, কখনো কোন জাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে, যখন সামনে সব দরজা বন্ধ, এমন অবস্থায় তার সাহায্যকে পাঠিয়ে। আমাকে চেনো আমি কে? খালিক কেউ আছে তো সেটা আমিই, মালিক আছে তো আমি, রাজ্জাক আমি, হাফিজ আমি, ক্বদির আমি, মুহয়ি আর মুু’মিন আমি, মুওয়াকি’ ও মানি’ আমি। আমি ছাড়া আর কেউ কোন কিছু নয়।
এই জন্য এই মানুষকে আল্লাহ তা’আলা আশরাফুল মাখলুকাত বানিয়েছেন। আর কত ছোট বড় মাখলুকের মধ্যে! শারাফত ও কারামতের তাজ, সম্মান ও বুজুর্গির মুকুট এই মানুষের মাথায় পড়ালেন। আর এর অনেক উন্নতি, অনেক সম্মান, অনেক মর্যাদা, অনেক যোগ্যতার কথা আল্লাহ তা’আলা বয়ান করেছেন। আর কছম খেয়ে খেয়ে বয়ান করেছেন।
এই মানুষকেও বলে দিয়েছে, বুজুর্গি তোমার ততক্ষণ, কারামত ততক্ষণ, যোগ্যতা ও মূল্য তোমার ততক্ষণ, সম্মান ও মর্যাদা শুধু তুমি ঐ সময় পর্যন্ত পাবে, যতক্ষণ তুমি আমার বান্দা হিসেবে জীবন যাপন করবে। এই জন্য, উলামায়ে কেরাম লিখেছেন, মানুষের জীবনের প্রথম উদ্দেশ্য, মানুষ হওয়ার যোগ্যতা, পুরুষ হোক বা মহিলা, আরবী হোক বা আজমী, পূর্বের হোক বা পশ্চিমা, ব্যবসায়ী হোক বা মজদুর, হাকিম হোক বা মাহকুম হোক, মালদার বা গরীব, যে যেখানে যে অবস্থায়, আদম (আঃ) ও হাওয়ার সন্তান যাকে বলা হয়, তার জীবনের প্রথম উদ্দেশ্য, নিজের খালিককে, নিজের মালিককে, নিজের পালনকর্তাকে, সবকিছু কর্তা ধর্তাকে মানা, তাকে চেনা, তাকে মানা, তার হুকুমকে মানা। এটা প্রথম ফরজ, ফরজে মানছাবী বলে একে।
এই জন্য এক জায়গায় ঐ সব মানুষকে যারা তাদের রবের পরিচয় থেকে দূরে, কিন্তু পেট্রোলের সাথে তাদের পরিচয় আছে, তারা প্লাটিনামকে চেনে, ভূমন্ডলের উপরের জগৎসমূহের খোঁজ খবর রাখে, ঠান্ডা ও গরমের মৌসুম, আর এই তারকা থেকে ঐ তারকা কতগুণ বড়, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্ব সবকিছু জানে। জানে না তো শুধু নিজের খালিক ও মালিককেই জানে না। কুরআন শরীফে বলে দিয়েছে, সে নিজেকে চাই যা কিছুই মনে করুক না কেন, “এরা চতুষ্পদ পশুর মত বরং এর চেয়েও নিকৃষ্ট।” কারণ একটা পশুও তার চরানে ওয়ালাকে, তার দেখাশুনা করনেওয়ালাকে, শীতের সময় শরীরে কাপড় পেচিয়ে দেয়া আর গরমের সময় শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেনেওয়ালাকে চেনে। যে কোন জায়গায় ওকে ছেড়ে দাও, সোজা ওর মালিকের ঘরে গিয়ে দাঁড়াবে। এতটুকু শিক্ষাও তো তুমি ওর থেকে নাও!
এই জন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা খুব জালালের মধ্যে, খুব ক্রোধান্বিত অবস্থায় বলছেন, সর্বনাশ হোক ঐ ব্যক্তির, সর্বনাশ হোক ঐ ব্যক্তির, সে এত অকৃতজ্ঞ যে, যার চোখ আমার দেয়া, জবান আমার দেয়া, কান আমার দেয়া, জীবন আমি দিলাম, আকাশ এর জন্য, জমিন এর জন্য, চন্দ্র সূর্য এর জন্য, ফল-মূল ও প্রকৃতির সবকিছু এর জন্যে। যদি আল্লাহর নেয়ামত সমূহ গুণতে চাও, তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না। এই সবকিছু আমি এর জন্যে দিলাম। আর এ দম্ভ ভরে বুক ফুলিয়ে চলে, আমার না-শোকরি করে, আমার নাফরমানি করে। অথচ শয়তানকে তো খুব মেনে চলে। শয়তান ওকে নাচিয়ে নেয়। এই জন্যে আল্লাহ তা’আলা সূরা আ’দিয়াতে মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, এতটুকু তো বুঝ!
আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বিভিন্ন সময়ে প্রত্যেককে নিজের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। একটা অসহায় শিশু যার কাছে না খাবার মত কোন দুধ আছে, না পানি আছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের ভিতরে ভাসছে। যার থেকে বাঁচানোর সমস্ত প্রচেষ্টা, তার কোলেই পৌঁছালো। আর তার কোল থেকে বাঁচিয়ে নিজের ওয়াদাকে পুরা করলেন।
হযরত মুসা (আঃ) এর মাকে বলা হলো তার বাচ্চাকে সিন্দুকে ভরে সমুদ্রে ফেলে দিতে। এটা কি কোন মায়ের দ্বারা করা সম্ভব? যে মা নিজের কোল থেকে তার শিশুকে দূরে করতে চায় না, নিজের বুক থেকে কখনো পৃথক করতে চায় না, সেই মা? নিজের হাতে? এই অসহায়কে? এইভাবে? হ্যা, হ্যা, ঐভাবেই করো যেভাবে আমি বলি। “আমি ইলহাম করলাম মূসা (আঃ) এর মাকে।” তুমি কে? তুমি এর মা। আর মা হওয়ার সুবাদে তোমার এই বাচ্চাকে দুধ পান করাতে হবে। মা’বুদ আমি, মাকসুদ আমি, খালিক আমি, হাফিজ আমি,সবকিছুর কর্তাধর্তা আমি। আমি বলছি, একে সিন্দুকের মধ্যে ভরো, আর এর পর সমুদ্রের ভিতর ফেলে দাও। এর সাথে আমি এও বলছি, যত রাস্তা আছে ভয়ের, সমুদ্রের ঢেউ বড় ভয়ের। এই বুঝি ডুবে গেল, এই বুঝি মরে গেল। ভয়ের রাস্তা দুনিয়াতে অনেক আছে। আকাশ খারাপ হবে, বিদ্যুৎ চমকাবে, ভূমিকম্প হবে, সব আমার হাতে। কোন অবস্থাতেই ভয় পাবেনা। ভয় পাবার মত অবস্থা অনেক আছে। কোথাও জমীন, কোথাও রাজত্ব, কোথাও সম্পদ, কোথাও ক্ষমতা, কোথাও অস্ত্র, কোথাও সংখ্যাধিক্য, কোথাও সৈন্যবাহিনী, কোথাও পাওয়ার, ভয় দেখানোর উপকরণ অনেক আছে। এই জন্য মনে রেখো, কুরআনুল কারীমে যত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ওয়া তাসলিমাত, রুসুলে এযাম আলাইহিমুস সালাম ওয়া তাসলিমাত এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো শুধু নিছক গল্প নয়, বরং এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম। কারণ এই কুরআন হুদাল্লিন্নাস। যে যেখানে যে অবস্থাতে আছে, তার রাহবারি, পথ প্রদর্শন কুরআন থেকে মিলবে। সে কুরআনের নির্দেশিত পথে নিজের জীবন পরিশুদ্ধ করতে পারবে। বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে মানবজাতির পথ প্রদর্শণ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য। অবস্থা বিভিন্ন রকম হবে, নকশা বিভিন্ন রকম হবে। জিভে পানি এসে যাওয়ার মত অবস্থা, লালা টপকে পড়ার মত অবস্থা, এমনকি ঈমান বিক্রি হয়ে যায়, আকিদার সর্বনাশ হয়ে যায়, আর আগে বাড়তে বাড়তে বাড়তে বাড়তে মানুষ পশুর কাতারে চলে যায়। লোভের শেকেলে, অবস্থা অনেক আছে। লোভে ফেলার নকশা অনেক আছে। ভয় দেখানোর শেকেল অনেক আছে। এই সমস্ত রাস্তা থেকে কুরআন কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষকে সতর্ক করছে। বুঝাচ্ছে। শিক্ষা দিচ্ছে। “ভয় করবে না, বিপদে ভীত সন্ত্রস্ত হবে না। দুশ্চিন্তা করবে না। আমার কথা মত কদম উঠাও।”
ঘটনাতো হযরত মূসা (আঃ) এর মায়ের। আর আয়াত সমূহ তার সম্পর্কিত। কিন্তু এটা নসীহত আমার জন্যে, নসীহত পুরা মজমার জন্যে, নসীহত পুরো দেশের এক এক বাসিন্দার জন্যে, পুরো পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্যে। ওহে মানুষ! যাকে তুমি ভয় করবে সেই সত্ত্বা হলেন শুধুমাত্র আল্লাহ। যার কাছে কিছু পাবার আশা করা যায়, সেই সত্ত্বা শুধুমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ বলছেন, আমি ওয়াদা করি, ওয়াদা ভঙ্গ করি না, আমি মিথ্যা বলি না।
“আল্লাহর চেয়ে সত্য কথা আর কার হতে পারে?”
আমি বলছি। আমি যা বলছি তা তুমি করো। যে কোল থেকে আমি নিচ্ছি সেই কোলেই আবার এই বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিয়ে দেখাবো। আর শুধু মূসা হিসেবে পাঠাবো না। শুধু মূসা বানিয়ে ফিরিয়ে দেবো না। সমস্ত মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেন আল্লাহর নবীগণ (সাল্লাল্লহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম)। নবুওতের মুকুট, পয়গম্বরির তাঁজ মাথায় পড়িয়ে পাঠাবো।
নিজের সাথে পরিচয় করাচ্ছেন। এই শিশুর মাধ্যমে। ঐ শিশুর মাধ্যমে যার মায়ের বুকে দুধ নেই। দুধের কোন ব্যবস্থা নেই। পানি পান করাতে চায়, তো সামান্যটুকু পানিও নেই। শরীর বিক্ষত হচ্ছে। বাপ আল্লাহর রাস্তায় আছে। আর মা! মায়ের মমতা তো বড়ই প্রসিদ্ধ। কখনো সাফা, কখনো মারওয়া কখনো সাফা, কখনো মারওয়া, কখনো এখানে কখনো ওখানে,কেউ আমার এই বাচ্চাকে, ঈসমাইলকে একটু পানি পান করিয়ে দিক। এক ফোঁটা পানি। কোন কাফেলা, কোন মানুষ। এখানে কী দেখানো হচ্ছে? মানুষকে না তার বাপ পালে, না মা পালে, না ভাই, না ছেলে। না কারখানা পালে না ফ্যাক্টরি। না জমিন না আসমান। পরওয়ারদিগার, পালনকর্তা, রিযিকদাতা শুধু এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আল্লাহ তা’আলা দেখালেন, কিভাবে ঈসমাইল (আঃ) কে বড় করলেন। কিভাবে তাকে হেফাজত করলেন। আর শুধু কি তাকে রুটি খাইয়ে হেফাজত করলেন? কত বড় কাজ নিলেন তার মাধ্যমে। কত বড় নবী, কত বড় পয়গম্বর, সমস্ত নবীর সর্দার, হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেই বিক্ষত শরীরের শিশু, ক্ষুধার্থ সেই শিশুর বংশ থেকে তৈরী করলেন। আমাকে চেনো আমি কে, আমাকে চেনো আমি কে, আমাকে চেনো আমি কে। লা ইলাহা ইল্লাল্লহ। করনেওয়ালা জাত শুধু আমি।
তোমরা দেখ নাই, ইউসুফ (আঃ) এর ভাইয়েরা তার সাথে কেমন আচরণ করল? ভাইদের কারনে তো সে জেলে গেল। জেল থেকে বের করে ইউসুফ (আঃ) কে প্রাসাদে কে নিয়ে গেল? আমাকে চেনো আমি কে? জঙ্গলে ভরা প্রান্তরে হেফাজত করনেওয়ালা আমি। সমুদ্রের ঢেউ থেকে বাঁচিয়ে তীরে ফিরিয়ে এনে নিজের মায়ের কোলে পৌঁছে দেনেওয়ালা আমি। বালিকে আটায় পরিণত করনেওয়ালা আমি। জেল থেকে প্রাসাদে পৌঁছানে ওয়ালা আমি। আমাকে চেনো, আমি কে?
এই জন্য সমস্ত নবী, সমস্ত পয়গম্বর আলাইহিমুস ছালাম ওয়া তাছলিমাত, যারা প্রত্যেক যামানাতে নিজ নিজ কওম ও নিজ নিজ উম্মতরে প্রতি কল্যাণকামী হিসেবে এসেছেন আর আল্লাহ তাদেরকে পাঠিয়েছেন, তাদের সবার দাওয়াতের প্রথম কালেমা, প্রথম আহ্বান, প্রথম আওয়াজ এই ছিল, “কুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তুফলিহু।” আল্লাহকে মেনে নাও। তারই নামের যিকির করো, দেখ তো তার নজরেই দেখ, শুনো তো তার কথা শুনো, বলো তো তার কথা বলো। চিন্তা করলে তার কথা চিন্তা করো, ভিক্ষার জন্য হাত বাড়াবে তো তারই দরবারে যাও আর তার দাওয়াত পুরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দাও। আল্লাহ, আল্লাহ, আল্লাহ।
আমরা আল্লাহর বান্দা। প্রতিটা মানুষ, নারী হোক বা পুরুষ, আল্লাহর বান্দা আর আল্লাহর বান্দি। পূর্ববর্তী উম্মত অতিবাহিত হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) অতিবাহিত হয়ে গেছেন। আরো যারা আছে সবার জন্য। হুযুর সল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা’আলা বলছেন, ‘আপনি আপনার জবান দ্বারা এই কথা বলে দিন, হে মানবজাতি! তোমাদের সবার জন্য আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন।’ তোমার মাল কোথায় ব্যয় হবে, তোমার সময় কোথায় ব্যয় হবে, তোমার যোগ্যতা কোথায় লাগবে, সৃষ্টির সেরা তুমি কিভাবে বনবে, দুনিয়া কিভাবে বানাবে, আখিরাত কিভাবে বনবে, সব বিষয়ের রাহবারি, পথ প্রদর্শন আমি করব। আল্লাহু আকবার। দো জাহানের বাদশা হুযুর (সাঃ) এর জন্মের পরে কি অবস্থা হলো!
যেমন ওদিকে ইবরাহীম (আঃ) এর শাহজাদা ইসমাইল (আঃ)। হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল কাঁদতে কাঁদতে। হায় আমার আদরের ইউসুফ। এদিকে যেমন হযরত মূসা (আঃ) এর মা।
তো রাসূলে কারীম (সাঃ) এর জন্ম হল। দোজাহানের বাদশাহের জন্ম। জন্মের পরেই তো বাপ মারা গেল। এতিম সন্তান। আর তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী মহিলারা তাদের বাচ্চাকে নিয়ে ঐ মেলায় যেত, যেখানে দুধপানকারিণী মহিলারা অর্থের বিনিময়ে ঐ বাচ্চাকে নিয়ে যেত। বাহ! আল্লাহর কি শান! আমরা তোমকেই চিনছি। আমিনাও তার আদরের সন্তানকে নিয়ে আসলেন এই মেলায়। হুযুর (সাঃ) কে দুধ পানকারিণী আসছেন। এই বাচ্চা অমুক গোত্রের, অমুক খান্দানের, এর জন্য এত দৌলত, এত টাকা দেওয়া হবে। এই বাচ্চাকে দুধ পান করাবে তো এটা পাবে, এটা পাবে। আমিনার সন্তানের ওপর যখন কারো নজর পড়ে, ও হো, বাপ তো নাই-ই, দাদার বারো ছেলে, বারো পরিবার। আর ঐ বারো জনের কত গুলো করে সন্তান? এতসব নাতি নাতনীর মধ্যে একজন! যদি আমরা একে দুধ পান করাই তবে আর কি মিলবে? আমিনার কোলের দিকে কেউ হাত বাড়াতে রাজী নয়।
আল্লাহ করুক, আল্লাহ করুক। আমরা এই আমিনার আদরের সন্তানের দাওয়াতের জন্য জান পেশ করনেওয়ালা, আমিনার প্রিয় পুত্রের জন্য জীবন উৎসর্গকারী হই। সে আমিনার পুত্র,মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ), যে পুরো মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্খী। যদি আমিনার কোলের দিকে কেউ হাত না বাড়ায়, তবে সেটা তার দুর্ভাগ্য। মুহাম্মদ (সাঃ), যে আমিনার কোলের সেই সোনার টুকরা, তার দিকে হাত বাড়ানো তো নবুওতের এই সহজ সরল রাস্তা, এই কাজের দিকে হাত বাড়ানো। অনেক কষ্টে একজন মহিলা এগিয়ে আসল।
এইজন্য নবুওতের এই কাজ মাল দৌলতের দ্বারা, এই কাজ হুকুমতের দ্বারা, এই কাজ ক্ষমতার দ্বারা, জমীনের দ্বারা, দুনিয়ার কোন নকশার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা নিবেন না। একজন গরীব মহিলা, যার স্তনে নিজের পেটের সন্তানদের জন্যই পর্যাপ্ত দুধ নেই, এই কথা ভেবে এগিয়ে এলো যে, এরা তো সবাই নিয়ে গেল, আমি কি খালি কোল নিয়েই ফিরে যাবো?
এই পুরা মজমার কাছে আমাদের দরখাস্ত, যারা দুনিয়া লুটছে, তাদেরকে লুটতে দাও। লড়তে দাও তাদেরকে। ক্ষমতার জন্য, কুরছির জন্য তারা মারপিট করুক, লুটপাট করুক,করতে দাও। আমি বলছি। তোমরা আখিরাত ওয়ালা বনো।
এই এস্তেমার প্রতিটা লোক, যেমন মা হালিমা এসে হুযুর (সাঃ) কে নিয়ে গেলেন, এই মজমার প্রতিটা লোক হুযুর (সাঃ) এর দাওয়াতকে, হুযুরওয়ালী কালেমাকে, হুযুরওয়ালী নামাযকে, হুযুরওয়ালী এলেমকে, হুযুরওয়ালী আমলকে, হুযুরওয়ালী বদর ওহুদ খন্দক তবুককে, হুযুরওয়ালী হিজরত ও নুসরতকে সাথে নিয়ে যাক। আল্লাহর জন্য এটা কোন কঠিন কাজ নয়।
এদিকে হালিমা সাদিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা, ঐ একই তো কথা, আল্লাহ যার ভাগ্য খুলে দেন! ওদিকে মূসাও ছোট বাচ্চা, ইউসুফ বাচ্চা, ইবরাহীম (আঃ) এর ছেলে ইসমাইল বাচ্চা। ওখানে মুসা (আঃ) এর মা একজন মহিলা, হাজেরা একজন মহিলা। আল্লাহ তা’আলা দেখাচ্ছেন। নিজের সাথে পরিচয় করাচ্ছেন।
তো হালিমা সাদিয়া (রাঃ) নিয়ে নিলেন। তারপর উনি কি বললেন? প্রথম দিন থেকেই বরকত। নিজের সন্তানের জন্যই পর্যাপ্ত দুধ ছিল না। আর এখন এ বাচ্চাকে কোলে নেয়ার পরে,উভয় সন্তানের পেট ভরে পান করার মত দুধ! চেনো আল্লাহ তা’আলাকে, চেনো আল্লাহর নবীকে। আল্লাহর জন্য জীবন দিয়ে দাও, নবীর পিছু ধরো, আর নবীর পথে বের হয়ে পড়ো,তারপর দেখ বরকত, দেখ রহমত, দেখ নুসরত, দেখ সাহায্য, দেখ নিরাপত্তা, দেখ শান্তি, দুনিয়াতেও আর আখেরাতেও।
কি বলা হয়েছে? “এটা সেই এতীম, যে পড়তেও জানে না, লিখতেও জানে না।” আল্লাহ নিজের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। “আপনাকে পড়াবো তো আমি। আপনাকে আগে বাড়াবো আমি।” বড় করবো আমি, পড়াবো আমি। সবার সর্দারির তাঁজ এর মাথায় পড়াবো। এখানেও একটা বাচ্চার শেকেলে। প্রত্যেক রাস্তায় আল্লাহ নিজের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। নবুওতের তাঁজ কত বড়! মা-বাপ তো কেউ নেই, যারা দুএক জন ছিলেন তারাও চলে গেলেন। দাদাও গেলেন, চাচাও গেলেন। আল্লাহ তাআলা সবক পড়াচ্ছেন, না দাদা রাজ্জাক, না বাপ রাজ্জাক, না চাচা, না ভাই, এরা কেউ রিজিক দেনেওয়ালা নয়। না বিদেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থ, না তোমার জমীন থেকে উৎপন্ন শস্য। রাজ্জাক, রিজিক দেনেওয়ালা জাত শুধুমাত্র আল্লাহ।
হুযুর (সাঃ) এর কি শৈশব! তারপর নবুওতের তাঁজ তাকে দেওয়া হল। সবচেয়ে ভাল কাজ বলা হল। যে নবীর কাজকে নিজের কাজ বানাবে, নবীর মেহনতকে নিজের মেহনত বানাবে,নবীর চোখের পানিকে নিজের অশ্র“ বানাবে, নবীর কালেমাকে, নবীর ব্যথাকে, নবীর সেজদাকে, নবীর নামাজকে, নবীর সফরকে ও তার ঘরে অবস্থানকে, নবীর হিজরতকে,নুসরতকে, নবীর কাজকে যে নিজের কাজ বানাবে, আর যে যত বেশি নবীর রং ও রূপ নিজের মধ্যে আনবে, সে নিজের চোখেই দেখবে আল্লাহর সাহায্য।
আর এর সাথে এই কথাও শুনে রাখো, যে যতো নবীর বিরোধী, নবীর রাস্তা ছেড়ে এদিকে চলবো, ওদিকে চলবো, এটা করবো, ওটা করবো, এটা নিয়ে নেই, ওটা নিয়ে নেই, একে হাত করি, ওকে খুশি করি, ওমুকের সাথে যোগাযোগ, তমুকের সাথে যোগাযোগ, তার সাথে কনটাক্ট। মার খাবে, মার খাবে, আর এতই মার খাবে যে বত্রিশটা দাঁতের একটাও থাকবে না।
যে কোন ব্যক্তি, পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তরে বা দক্ষিণে, পুরুষ হোক বা মহিলা, ছোট হোক বা বড়, ব্যবসায়ী, মজদুর, হাকিম, মাহকুম, যে যেখানে যে লাইনে, যে কোন শ্রেণীতে,হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে বিরোধিতা করবে অথবা কোন ফিৎনায় জড়িয়ে পড়বে আর যদি সে তওবা করা ছাড়া এস্তেগফার করা ছাড়া নিজের জীবনের রোখ শুদ্ধ করা ছাড়া,মেহনতের গন্তব্য, উদ্দেশ্য পরিবর্তন করা ছাড়া মারা যায়, তবে সেখানে সে আজাবান আলীম, কঠিন আজাবে গ্রেফতার হবে।
পুরা মজমা এই এক্বীনের সাথে যে, দাওয়াতের এই সাদাসিদা মেহনত, এই উমুমি মেহনত, যদি আমিনার কোল থেকে হযরত হালিমা (রাঃ) নেওয়ার ফলে তার ভাগ্য খুলে যায়। আর তার নিজের কওম সহ পুরা দুনিয়ার হেদায়েতের সামান, হেদায়েতের মাধ্যম তার কোলে পৌঁছানো হয়। আল্লাহর কসম! যদি এই মেহনতকে আমরা মেহনত বানাই, আর এই পুরা মজমা এই নিয়ত করে নেয়, যদি হযরত হালিমা (রাঃ) ঐ এতীম বাচ্চাকে নিজের কোলে নিয়ে নেয়, এই মজমার এক একজন ব্যক্তি, যে যেখান থেকে এসেছে, আমাদের বিদেশী মেহমান যত আছে, দেশী মজমা যত আছে, প্রত্যেকে এই অনুভুতি নিয়ে যাই যে, আমরা আমাদের কোল ভরে এই মেহনতকে নিয়ে যাচ্ছি। দাওয়াতের এই কাজকে আপন সিনায় জড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি। জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে, জীবন এতেই ব্যয় করব, মাল এতেই খরচ করব, যোগ্যতা এর জন্যই ব্যবহার করব। হযরত হালিমার (রাঃ) কোল থেকে ছড়িয়ে পড়া সমস্ত বরকত, সমস্ত রহমত আমরাও পাবে, যখন এই মেহনতকে করতে থাকব মনপ্রাণ দিয়ে, চোখকান খুলে। “মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকি বাছিরাতের সাথে”।
আল্লাহর ঐ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যাকে কেউ বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে না, দুধ পান করানোর মত কেউ নেই, যাকে কেউ কোলে নিচ্ছে না, যার উপরে বাপের ছায়া নেই, দাদা আর চাচাও দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। যখন তাকে নবুওতের তাঁজ পরানো হলো, জিম্মাদারি দেয়া হলো, তো তখন তিনি দাওয়াত দিচ্ছেন, আমি যে এই দাওয়াত দিচ্ছি, এটাই আমার রাস্তা।
‘আপনি বলে দিন, এটা আমার রাস্তা। মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকি বাছিরাতের সাথে, আমি ও আমার অনুসারীরাও।’ কাকে বলা হচ্ছে? যাকে রহমাতুল্লিল আ’লামিন করে পাঠানো হয়েছে, যাকে পুরো মানবতার জন্য নবী করে পাঠানো হয়েছে। তার জবান দিয়ে বলানো হচ্ছে যে, আপনি বলে দেন, এটাই আমার রাস্তা, মানুষকে ইমানের দাওয়াত দেয়া।
আল্লাহর প্রত্যেক বান্দাবান্দি, আল্লাহ থেকে লেনেওয়ালা হয়ে যায়। আল্লাহর আজমতকে, আল্লাহর বড়ত্বকে, আল্লাহর জাত ও সিফাতের উপর ঈমান বানাতে বানাতে আল্লাহর খাজানা থেকে নেয়ার রাস্তা তৈরী কর, আর এটাকে নিজের জীবনের অবলম্বন বানিয়ে নাও। তারপর দেখ নিজের চোখে।
এক এক জন বান্দাকে দাওয়াত দেয়া, এক এক জনকে বুঝানো, আর সবাই এই এক্বীনের সাথে, যেমন স্বয়ং হুযুর (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘আমার উদাহরণ আর আমার সাথে যে হেদায়েত এসেছে তার উদাহরণ পানির মত, বৃষ্টির পানির মত। সারা বিশ্বে যত টেকনোলজি আছে, আর যে যত লাইনে উন্নতি করছে, যাকে তারা উন্নতি বলছে। কিন্তু সারা বিশ্বে একজন ব্যক্তি এটা বলুক যে পানি ছাড়া চলতে পারে, যার পানির প্রয়োজন হবে না। প্রকৃতপক্ষে এটা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর পয়গাম। কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে সবার উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে, যে যেখানেই থাকুক, যে পোস্ট ও পজিশনেই থাকুক, যেমন তোমার পানি ছাড়া কোন উপায় নেই, তেমনি আমার অনুসরণ ছাড়া আমার পথে চলা ব্যতীত, আমার কাজকে কাজ না বানিয়ে, আমার চিন্তাকে চিন্তা বানানো ছাড়া না তোমার দুনিয়া তুমি বানাতে পারবে, না তোমার আখেরাত বানাতে পারবে।
এই জন্য শুধু চিল্লা, তিন চিল্লা, সাল, দো সাল কোন কথা নয়। এই এক্বীনের সাথে, যেমন হযরত হালিমা (রাঃ) নিয়েছিলেন, আমরাও এখান থেকে দাওয়াত নিয়ে যাবো, দাওয়াতের তাকাজার উপর জীবন দিয়ে দিব। এই এক্বীনের সাথে যে, আমার ঘরের সুঁই সুতার প্রয়োজন থেকে শুরু করে আমার জান্নাতে প্রবেশ করা, আমার জাহান্নাম থেকে বাঁচা, আর শুধু আমিই নই, আমার বিবি বাচ্চা, খান্দান, আমার গোত্র, পুরা দুনিয়ার এক এক জন মানুষ, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের, পূর্বের বা পশ্চিমের, আদম (আঃ) এর বেটা আর হাওয়ার বেটি, যে কোন মানুষ, তার দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার ছামান, শুধু এবং শুধুমাত্র মুহাম্মাদ (সাঃ) ওয়ালা দ্বীন, মুহাম্মাদ (সাঃ) ওয়ালা শরীয়ত, মুহাম্মাদ (সাঃ) ওয়ালা সুন্নাত। আর সুন্নাতের মধ্যে বড় সুন্নাত, প্রথম সুন্নত, আযীম সুন্নত, আর সমস্ত সুন্নতের মা, যেমন মায়ের থেকে বাচ্চা আসার সিলসিলা চলে, মহা সুন্নত। যেদিন হুযুর (সাঃ) কে নবুওতের তাজ পড়ানো হল,ঐ দিন সবার প্রথম তিনি ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। এটা সমস্ত সুন্নতের মা।
আমরা সবাই এটাকে আমার কাজ বানাবো, এই এক্বীনের সাথে যে, শুধু আমার নয় বরং পুরো পৃথিবীর সমস্ত মানুষের বনার, সম্মানের মুকুট পরিধানের, বার মাস শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকার, হেফাজতের, বরকতের, রহমতের, নিশ্চিন্ততার, সাহায্যের, নুসরতের বৃষ্টি বর্ষণ হবে হুযুর (সাঃ) এর সুন্নতের উপর চলার দ্বারা । আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির মত বর্ষণ করবেন। এই এক্বীনের সাথে এই পুরা মজমাকে এই কাজ নিয়ে চলতে হবে। এর জন্য নিয়ত করি এর জন্য এরাদা করি এর জন্য নিজের জান ও মালকে খরচ করি।
হযরত হালিমা সাদিয়া রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা হুযুর (সাঃ) এর জাত কে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর হুযুর (সাঃ) কোন ব্যক্তি? তার আপাদমস্তক, তার বাহির, তার ভিতর, তার মাথা,মাথার চুল, পায়ের নখ মেবারক, তার চোখ-কান, শিরা-ধমনী, তার চেহারা মোবারক, কন্ঠ, জিহবা, এক একটি অঙ্গ সরাসরি রহমত। হযরত হালিমা (রাঃ) হুযুর (সাঃ) এর শরীর মোবারককে নিয়ে গেছেন, তাতেই কত বরকত, কত রহমত, কত মদদ! এই সব হুযুর (সাঃ) এর জাতকে নিয়ে যাওয়ার কারণে। তাই এই এস্তেমা, হুযুর (সাঃ) এর কাজকে কাজ বানানো, হুযুর (সাঃ) এর চিন্তাকে চিন্তা বানানো। সমস্ত মদদ, সমস্ত হেফাজত, সমস্ত শান্তি শৃঙ্খলা হুযুর (সাঃ) এর কথার সাথে এবং হুযুর (সাঃ) এর কাজের সাথে।
যখন আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি, আমাদের ব্যবসায়ি, আমাদের মজদুর, আমাদের চাকরিজীবী, আমাদের কারখানাওয়ালা, আমাদের ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই হুজুর (সাঃ) এর কথাকে নিয়ে চলবে, সর্ব প্রথম নিজের ঘরে হুজুর (সাঃ) এর অনুকরণের মধ্য দিয়ে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা ঘরওয়ালার জন্য নবী করে পাঠিয়েছিলেন। যে ব্যক্তি নিজ ঘরে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মেহনতকে চালাবে সে যেন ইসমাঈলী নূরকে লাভ করবে মুহাম্মদী মোহরের সাথে।
যে ব্যক্তি নিজের শহরকে মুহাম্মাদ (সাঃ) ওয়ালী মেহনতের ময়দান বানাবে, কিছু নবীকে একটা শহরের জন্য পাঠানো হয়েছিল, যে তার পুরা শহরকে, প্রত্যেক গলি, প্রত্যেক মহল্লা,প্রত্যেক ঘর, প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, তাকে আল্লাহ তা’আলা শোয়েবী নূর দান করবেন মুহাম্মদী মোহরের সাথে।
আর যে ব্যক্তি পুরা দেশকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, অনেক নবীকে আল্লাহ তা’আলা একটা পুরা দেশের নবী করে পাঠিয়েছিলেন। যেমন হযরত মূসা ও হারুন (আঃ) এবং অন্যান্য আরো যারা আম্বিয়ায়ে বনী ইসরাঈল এসেছেন, যে ব্যক্তি পুরা দেশকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, দেশের একেকটা বিভাগ, বিভাগের প্রত্যেকটা জেলা, জেলার প্রতিটা থানা, থানার প্রতিটি ইউনিয়ন , ইউনিয়নের মধ্যে যত গ্রাম আছে, গ্রামের কোন মহল্লা, কোন ঘর, কোন মানুষ এই মেহনত থেকে দূরে না থাকে, যে ব্যক্তি এভাবে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, আল্লাহ তাকে মূসায়ী নূর দান করবেন মোহাম্মাদী মোহরের সাথে।
যে নিজের কওম, নিজের এলাকাকে মেহনতের ময়দান বানাবে, আল্লাহ তা’আলা হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে তার কওমের কাছেই নবী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, যে তার কওমকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, আর মুহাম্মাদী দাওয়াতকে চালাবে, ঈমানের দাওয়াত দেয়া হলো, তালীমের হালকা, আল্লাহর জিকির, খুশু খুযু ওয়ালা নামায, প্রত্যেকে প্রত্যেকের হককে জানে ও তা আদায় করে, আর একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকে, যে এর জন্যে মেহনত করল নিজ কওমের মধ্যে, আল্লাহ তাআলা তাকে নূহয়ী নূর দান করবেন মোহাম্মাদী মোহরের সাথে।
কিন্তু আমরা না মূসা (আঃ) এর উম্মত, না নূহ (আঃ) এর উম্মত, না হযরত শুয়াইব (আঃ) এর উম্মত। আমরা তো আলমী নবীর উম্মত। শুরু করব নিজের জাত থেকে, ঘর থেকে, গলি থেকে, মসজিদ থেকে। এজন্যই তো বলা হয়, কাজ কাজ, কাজ, কাজ। আরে কাজ শুধু কথা বাড়ানোর নাম নয়, কাজ শুধু কথা বলার দ্বারা হয় না বরং প্রত্যেকে নিজের মসজিদের উমুমি গাস্ত করে, প্রত্যেকে নিজের মসজিদের ২য় গাস্ত করে, প্রত্যেক ব্যক্তি মাসে ৩ দিন সময় দেয়, আর ভাই ৩ দিন এই ভাবে নয় যে, মসজিদে গিয়ে বিছানায় পড়ে গেলাম আর মুসল্লিরা এসে ডেকে তুলল- ‘ও জামাতওয়ালারা ওঠ, নামাজের সময় হয়ে গেছে।’ প্রতিদিনের দুই গাস্ত, দুই তালীম, মসজিদে একটা আর নিজ ঘরে একটা, রোজানা মাশোয়ারা আর প্রত্যেক মসজিদে পাঁচ কাজ আর এই আড়াই ঘন্টার মেহনত তো বাচ্চাকে মক্তবে পাঠানোর মত। এই চারমাস লাগাও, চিল্লা দাও, ৩ দিনে যাও, তালীমে এসো, মাশোয়ারাতে বস,জিকির করে নাও, কুরআনের পারা পড়ে নাও, এসব বাচ্চাকে যেমন নাকি মক্তবে পাঠানো। ঐ পর্যন্ত বাচ্চা উ-হু, আ-হা, আমি আজ যাবো না, আজ ভালো লাগছে না এই সব করে। আর তাকে বুঝানো হয়, ‘আহা তোমাকে চকলেট দেয়া হবে,’ তো তাকে চকলেটের বড় প্যাকেট দেখিয়ে পাঠানো হয়। এইসব মেহনত তো এই চকলেট দেখানো কথার মত।
আল্লাহ করুক, আল্লাহ করুক, আল্লাহ করুক। এই মেহনতের স্বাদ একবার আস্বাদন কর। জীবন বিলিয়ে দেয়া হবে আল্লাহর রাস্তায়, জীবন বাজি লাগছে, আর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে, “ফুযতু ওয়া রাব্বিল কা’বা।” কা’বার রবের কসম, আমি সফলকাম হয়ে গেছি। হযরত হারাম বিন মুলহাম (রাঃ) কে কাফের বর্শা মারল, আর এমনভাবে মারল যে ওপার দিয়ে বের হয়ে গেল। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস, আর নিজের চোখে নিজের মৃত্যুকে দেখছেন আর কছম খেয়ে বলছেন, কাবার রবের কছম, আমি কামিয়াব হয়ে গেছি। যিনি এই জীবন দিয়েছিলেন, তার জন্যেই তা বিলিয়ে দিলাম।
এই জন্য মাওলানা ইউসুফ সাহেব (রহঃ) বলেছেন, ‘দায়ীর হায়াত ইসলামের হায়াত। দায়ীর মওত, সেটাও ইসলামের হায়াত।’ তো বর্শা মারার পরে সাহাবীর কথা শুনে ঐ কাফির হতবাক হয়ে গেল। এ মারা গেল, বিবি তো এর বিধবা হলো, বাচ্চা এর এতীম হলো, রক্ত এর প্রবাহিত হল, আর কছম খেয়ে বলছে, সে কামিয়াব হয়েছে! জ্বী হা! যিনি এই জীবন দিয়েছিলেন, যিনি ঈমান দিয়েছিলেন, যিনি মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কালেমা পড়িয়েছিলেন, যিনি সৃষ্টি করেছিলেন, যিনি এই মেহনতের জিম্মাদারি দিয়েছিল, এই জিম্মাদারি পুরা করতে করতে মৃত্যুবরণ করা, এটাই হলো চুড়ান্ত কামিয়াবী।
আর তুমি কিসের পিছনে পড়ে আছ? মাটির টুকরার পিছনে দৌড়াচ্ছো? পজিশন আর যোগ্যতা বানানোর পিছনে লেগে আছো? এটা কোন সফলতা নয়। বরং যে কাজের জন্য তুমি দুনিয়াতে এসেছো, সেই কাজ করতে করতে দুনিয়া থেকে যাওয়া, এটাই হলো সফলতার মুকুট। যখন ঐ কাফের এটা শুনল, তো সে বলল, ‘আচ্ছা, এর নাম তাহলে কামিয়াবি!’
এভাবে দাওয়াত দিলের মধ্যে পৌঁছে যায়। এই জন্য দাওয়াত শুধু কথার নাম নয়। বরং এটা ক্ষয়ক্ষতি বরদাস্ত করার নাম, এটা মোজাহাদার কাজ, এখানে আগে চলতে চলতে বিভিন্ন অবস্থা আসে।
তো ঐ বাচ্চাকে তার মা আমিনার কোল থেকে দুধ পান করাতে নিয়ে গেল, দুধের ব্যবস্থা হয়ে গেল। লালন পালন হচ্ছে, এক সময় বড় হয়ে গেল, নবুওতের মুকুট পড়ানো হল, তারপর হল হিজরতের হুকুম।
চারদিকে শোরগোল শুরু হয়েছে। ঘরে ঘরে হুজুর (সাঃ) এর বিরুদ্ধে স্কীম তৈরী হচ্ছে। মিটিং হচ্ছে, মাশোয়ারা হচ্ছে, বড় বড় পুরস্কারের ঘোষণা হচেছ। আর তখন কেমন অবস্থা ছিল?প্রখর রৌদ্র, মরুময় প্রান্তর, কাঁটাময় পথ। এখনকার মত নয় যে, চল ফাইভস্টার হোটেলে, ওখানে গিয়ে আরাম আয়েশ করি। থ্রিস্টার হোটেল নয়। ‘আল্লাহুম্মা লা আয়েশা ইল্লা আয়েশাল আখেরাহ।...’ তোমাদের নবী তোমাদেরকে সবক দিয়ে গেছে। হে আল্লাহ! আয়েশ তো হল জান্নাতের আয়েশ। আল্লাহর রাস্তার মুহাজিরগণের হালত, বিছানা, গাট্টি বোচকা নিয়ে চলছে, মাটিতে ঘুমাচ্ছে, ঠান্ডা গরম সহ্য করছে, ওদিকে বিবি-বাচ্চার মাসলা, আর এদিকে এরা অনাবাদি এলাকায় যাচ্ছে। মক্তব না থাকলে মক্তব কায়েম করছে। মসজিদ নাই তো মসজিদ বানাচ্ছে। আযান নাই তো আযান জিন্দা হচ্ছে, নামাজ জামাতের সাথে হচ্ছে। ওইদিকে জামাতের পর জামাত বের হচ্ছে। তোমার তো রাস্তা এটা। এটাই তোমার রাস্তা।
এই কাজকে আমরা কাজ বানিয়ে নেই। আমি তো বললাম, আমরা এখনও স্বাদ পাইনি। স্বাদ পেয়েছি ভাল বাড়ির, ভাল গাড়ির। আল্লাহ করুক, আল্লাহ করুক, আমাদের রুচির পরিবর্তন হোক। জ্বরগ্রস্ত ব্যক্তি কেমন! জ্বর হলে মুখে সবকিছু তিতা লাগে। তাকে যদি মিষ্টি চা দেয়া হয় তবে সে বলবে, ভাই, কত কালের শত্র“তার প্রতিশোধ নিচ্ছেন? এত তিতা?আরে না ভাই, তিন চামচ চিনি দিয়েছি। তেমনি আপনি তো বড় ইবাদতগুজার, বড় তাহাজ্জুদগুজার, কিন্তু চা তো তিতা লাগে। না ভাই চা তো বড়ই মিষ্টি। আর যখন জ্বর ভাল হয়ে যাবে, যখন জিহ্বার রুচি, স্বাদ বদলাবে তো এই তিতা চাকেই মধু বলবে, ভাই চা দিয়েছেন নাকি শরবত? আল্লাহ করুক আমদের দিলের রুচি বদলে যাক।
এই জন্যেই হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলে গেছেন, শুনে রাখো, ও ব্যবসায়ী, মজুর, ধনী গরীব, আম-খাস, বুড়ো-যুবক, পুরুষ-নারী, সবাই শুনে রাখো। প্রত্যেকের সিনার ভিতরে একটা গোস্তের টুকরা আছে। যখন সেটা ভাল থাকে, তখন পুরো শরীর ভাল থাকে। যখন ঐ গোস্ত বিগড়ে যায়, পুরো শরীর বিগড়ে যায়। চোখের দেখা, কানের শোনা, কদম উঠানো, দিমাগ দিয়ে চিন্তা করা সব বিগড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। আর গোস্ত বনলে শরীর বনে যায়। কিন্তু এটা সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ পরার দ্বারা বনে না। বরং এটা তালীমের হালকায় বনে। এটা ঈমানের দাওয়াত নিয়ে চলা, ঠান্ডা গরমে জ্বলা, মানুষের বাঁকা কথা বলা, মানুষের কঠোরতা, এগুলো বরদাস্ত করার দ্বারা এটা বনে। যখন এটা বনবে ঈমানওয়ালা, দিল ঈমানওয়ালা,চোখ ঈমানওয়ালা, কান ঈমানওয়ালা, চলাফেরা ঈমানওয়ালা, কামাই রোজগার ঈমানী, নামজ ঈমানী, হজ্ব ঈমানী। রুচি বদলে গেছে। যার এখন চিল্লা তিতা লাগছে, ৩ চিল্লা তিতা লাগছে, ঠান্ডা গরম সহ্য করা তিতা লাগছে, পায়দল চলা তিতা লাগছে। নিজের তাকাজাকে দাবিয়ে দ্বীনের তাকাজা পুরা করা তিতা লাগছে, এরই যখন রুচি বদলে যাবে তো সেই তখন বলবে, ওহহো, কী হলো। অনেক দেরী হয়ে গেল, মেহেরবানী আল্লাহর, আমার তো চল্লিশ বছর হয়ে গেল, ষাট হয়ে গেল, বাহাত্তর হয়ে গেল, আমি তো এখনো কাজ-ই বুঝলাম না। তিতাকে মিষ্টি আর মিষ্টিকে তিতা মনে করে এসেছি।
এই জন্য বলা হচ্ছে, শুধু চিল্লা ৩ চিল্লা উদ্দেশ্য নয়। মেহনতের রোখ সহীহ হয়ে যায়, দীলের রোখ সহীহ হয়ে যায়। মাওলানা ইলিয়াস সাহেব (রহঃ) বলতেন, ‘প্রত্যেক উম্মতে মোহাম্মদীর দীলের রোখ মাখলুক থেকে খালিকের দিকে, দুনিয়া ভরা ছামান থেকে নবুওতী আমলের দিকে, আর দুনিয়ার রং-রুপ, চাকচিক্য থেকে আখিরাতের সুখ, জান্নাতের নেয়ামতের দিকে হয়ে যায়।’ এই জন্য আমাদের হযরতজী, হযরতজী এনামুল হাসান (রহঃ) বলতেন, যেমন মানুষ লিখেছে ইসলাম একটা আমলি মাযহাব। এটাকে দর্শন বানিয়ো না। এই ইসলাম এটা প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে এর হাকীকতসহ এসে যায় এর জন্য চেষ্টা, এর জন্য দাওয়াত। এটাকে ফিলোসফী বানিয়ো না।
প্রত্যেকে তার চিল্লা, ৩ চিল্লা, ৩ দিন, তালিম, গাস্ত, আর নিজের কামাই রোজগার, সবকিছুর মধ্যে শরীয়তকে, সুন্নতকে নিয়ে আসে।
তো বলছিলাম, হযরত হালিমা (রা:) হুজুর (স:) এর জাতকে নিয়েছিলেন। যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বরকত আর বরকত, রহমত আর রহমত, নূরে নূরানীয়াত। প্রতিটি কথা প্রতিটি আচরণ। এই জন্য বড় হযতর হযরত মাওলানা ইলিয়াস সাহেব (র:) বলতেন, এই মেহনতের আসল মাকসাদ, মুহাম্মাদ (স:) যা কিছু নিয়ে এসেছিলেন তা পুরোপুরি ভাবে সমস্ত উম্মতের মধ্যে তার হাকিকত সহ জিন্দা হয়ে যায়। যার বুনিয়াদ ঐ কালেমা, যাকে উম্মত ভুলে গেছে। আরে, আমাদের এখানেতো এই কথা প্রসিদ্ধ যে, ভাই যেখান থেকে ভুলে গেছো সেখান থেকে আবার শুরু কর। এক লোক কিছু গুণছে। টাকার নোট বা অন্য কিছু। এক, দুই, বিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, তারপর ভুলে গেল। ভাই এখন কি করি? কেন, যেখানে ভুলে গেছ সেখান থেকে শুরু করো। এই উম্মতের সব জানা আছে। নিজের মেহনত ভুলে গেছে, নিজের কালেমার দাওয়াত ভুলে গেছে। নিজের নামাযকে নবীর নামাযের সাথে মিলানো ভুলে গেছে। নিজেকে নবুওতের রঙ্গে রঙ্গীন করা আর নবুওতের নূরে নূরানী বানানো ভুলে গেছে। এই মেহনতের মাধ্যমে উম্মতের ভুলে যাওয়া সবক পুনরায় স্মরণ করতে হবে। আবার,ঈমানের দাওয়াত দাও। খুশু খুযু ওয়ালা নামায শিখ।
এই জন্য হায়াতুস সাহাবাতে আছে, যাকেই কালেমা পড়ানো হত, তাকে সর্বপ্রথম নামাজ শিখানো হতো। কালেমা শেখো, নামাজ শেখো, কালেমা শেখো, নামাজ শেখো। দুনিয়া যে যাই বলে বলুক। আমাদের এই দুই জিনিস।
কারণ যদি হযরত হালিমা (রাঃ) হুজুর (সাঃ) এর জাত কে নিয়ে যান, তো হুজুর (সাঃ) এর ঐ সমস্ত বিষয় যা তিনি করিয়েছেন। আর তিনি তো চুলে চিরুনী করার তরীকাও বলে গেছেন। আবার মসজিদে চিরুনী করাকে নিষেধ করেছেন। হুজুর (সাঃ) চোখে সুরমা লাগানোর তরিকা বলে দিয়েছেন। কত দিনের মধ্যে দাড়ি পরিষ্কার করতে হবে তাও বলেছেন। গোসল কিভাবে করতে হবে, ওযু কিভাবে করবে, কি বলতে হবে আর কি না বলবে, সব।
যে ব্যক্তি এইটা দাবী করে সে, আমি আল্লাহকে আল্লাহ মানি, যে এটা দাবী করে যে আখেরাত সত্য তার জন্য করণীয় হল যখন বলবে তো ভাল কথা বলবে। আর ভাল কথা কি?সবচেয়ে ভাল কথা ঈমান। সবচেয়ে ভাল কথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কেউ কিছু নয়, এক একক জাত আল্লাহ।
নিজের ভাইয়ের সাথে কথা বলো, ভাস্তের সাথে, বোনের সাথে, বিবির সাথে, বেটির সাথে, মায়ের সাথে, খালার সাথে, দাদীর সাথে, নানীর সাথে। ঘরে বাইরে, অলিতে গলিতে,দোকানে, অফিসে, কারখানায়, যা বলবে তো ভাল বলো। এইটা হল ভুলে যাওয়া সবক। এই উম্মতকে আবার তা স্মরণ করতে হবে।
যেমনি ঐ মেলা থেকে হযরত হালিমা (রাঃ) হুজুর (সাঃ) এর জাতকে নিয়ে গেছেন, তেমনি এই এস্তেমা থেকেও প্রতিটা ব্যক্তিকে হুজুর (সাঃ) এর কথাকে, হুজুর (সাঃ) এর আচার-আচরণকে, হুজুর (সাঃ) এর সুন্নাতকে, হুজুর (সাঃ) এর কুরআনকে, হুজুর (সাঃ) এর নামাজকে, হুজুর (সাঃ) এর খুশু খুজুকে, হুজুর (সাঃ) এর বিনয় ও দাসত্বকে, হুজুর (সাঃ) এর সবর ও শোকরকে, সবকিছু নিয়ে যেতে হবে।
আর এই কথাও মনে রাখবো, এইসব নিয়ে যখন যাব, তো চলতে চলতে বিভিন্ন হালাত আসবে, সংকট আসবে। যেমন এসেছিল মক্কায়। মিটিং হচ্ছে। হিজরতের সময় শত্র“রা পিছু নিতে নিতে গুহার মুখে এসে পৌঁছল। আর হুজুর (সাঃ) আপন সাথীকে বলছেন, ‘ভয় করনা, চিন্তা করনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ এই দাওয়াতের রাস্তায় চলনেওয়ালা বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হবে।
নবুওতের মেহনতের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এসেছে নবী (আঃ) গণের উপর। এরপর যে যত বেশি নবীর রঙ্গে রঙ্গীন হবে, যে যত নবীর ফিকিরকে ফিকির বানাবে, যে যত নবীর নিকটবর্তী হবে তার উপর ঐরকম হালাত আসবে। কিন্তু, ‘পরিণতিতে তুমি সুসংবাদই প্রাপ্ত হবে।’
তো আমি আরজ করেছি, যে এই নবী ওয়ালা কাজকে নিয়ে যাবে, আমাকে তো আমার ঘর ঠিক করতে হবে, আমার বিবিকে নামাযী বানাতে হবে, বাচ্চাকে মক্তবে পাঠাতে হবে,মাদ্রাসায় পাঠাতে হবে। এই সব কাজ করবে তো ইসমাঈলী নূর পাবে মোহাম্মদী মোহরের সাথে।
আরা যে ব্যক্তি পুরা দেশকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, অনেক নবীকে আল্লাহতাআলা একটা পুরা দেশের নবী করে পাঠিয়েছিলেন। যেমন হযরত মূসা ও হারুন (আঃ) এবং অন্যান্য আরো যারা আম্বিয়ায়ে বনী ইসরাইল এসেছেন, যে ব্যক্তি পুরা দেশকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, দেশের একেকটা বিভাগ, বিভাগের প্রত্যেকটা জেলা, জেলার প্রতিটা থানা, থানার প্রতিটি ইউনিয়ন, ইউনিয়নের মধ্যে যত গ্রাম আছে, গ্রামের কোন মহল্লা, কোন ঘর, কোন মানুষ এই মেহনত থেকে দূরে না থাকে। যে ব্যক্তি এভাবে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, আল্লাহ তাকে মূসায়ী নূর দান করবেন মোহাম্মদী মোহরের সাথে।
যে নিজের কওম, নিজের এলাকাকে মেহনতের ময়দান বানাবে, আল্লাহ তা’আলা হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে তার কওমের কাছেই নবী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, যে তার কওমকে নিজের মেহনতের ময়দান বানাবে, আর মুহাম্মদী দাওয়াতকে চালাবে, ঈমানের দাওয়াত দেয়া হলো, তালীমের হালকা, আল্লাহর জিকির, খুশু খুয ওয়ালা নামায, প্রত্যেকে প্রত্যেকের হককে জানে ও তা আদায় করে, আর একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকে, যে এর জন্যে মেহনত করল নিজ কওমের মধ্যে, আল্লাহ তাআলা তাকে নূহয়ী নূর দান করবেন মোহাম্মদী মোহরের সাথে।
কিন্তু আমরা তো না মূসা (আঃ) এর উম্মত, না নূহ (আঃ) এর উম্মত। না কোন পূর্ববর্তী নবীর উম্মত। আমরা তো পুরা আলমের আলমী নবীর উম্মত। আমরা পুরা বিশ্বের নিয়্যত করব। এই জন্য মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বলতেন, নিজের মসজিদে গাস্ত করো তো পুরা বিশ্বের নিয়্যত করো। নিয়্যত করা তো আমাদের জিম্মায়। আর নামাজ কায়েম করে দেয়া আল্লাহর জিম্মায়। নিয়্যত করো যে, আমরা হুজুর (সাঃ) এর কথার উপর হুজুর (সাঃ) এর কাজ কে নিয়ে যাব।
আর হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হুজুর (সাঃ) এর মেহমানদারী করেছিলেন। এই সম্মান পৃথিবীর আর কেউ পেতে পারবে না। আর কেউ হুজুর (সাঃ) এর মেজবান হতে পারবে না। তবে হ্যা, হুজুর (সাঃ) তার মেহমানদারীর বিষয় তার উটনীর উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন যে, উটনী যেখানে বসে পড়বে সেখানেই তিনি মেহমান হবেন। এই ঢাকার এস্তেমা, এই বাংলাদেশের এস্তেমা, এটা হুজুর (সাঃ) এর রুহানী উটনী স্বরুপ।
ওহে বাংলাদেশ বাসী! ও বাইরের মেহমান! আপনারা এই এস্তেমা কে হুজুর (সাঃ) এর রুহানী উটনী মনে করে এর একরাম, এর এহতেরাম, এর জন্যে লালায়িত, আগ্রহান্বিত, যেমন মদীনাতে উটনী চলছিল তো সবার দিলে আকাঙ্খা ছিল এটা আমার এখানে বসে পড়–ক, ঠিক তেমনি পূর্ব-পুশ্চম, উত্তর দক্ষিণ সবাই এই আশা করে যে, আকাবিরগণ আমাদের দেশে আসুক, এখানে এই এস্তেমা হোক।
যদি এর না-কদরী হয়, অবমূল্যায়ন হয়, মনে রেখো, প্রত্যেক বস্তুর দুটি রূপ থাকে। নেগেটিভ পজেটিভ। যদি এই এস্তেমাকে খেলা বানাও, তামাশা বানাও, এটাকে অর্থ সম্পদ জমানোর মাধ্যম বানাও, নিজের ক্ষমতা পদমর্যাদা, পোস্ট পজিশন, নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ আর দুই পয়সা কামাইয়ের রাস্তা বানাও, তাহলে এর চেয়ে বড় দুর্ভাগা আর হতভাগা কেউ হবে না।
আর যদি একে নবী (সাঃ) এর রুহানিয়াত লাভের উপায় মনে করে, জান নিজের লাগালো, মাল নিজের লাগালো, আল্লাহর মাখলুকের নিকট থেকে প্রয়োজনে করয নিল, আগত মেহমানদের একরাম করলো, তাদেরকে দ্বীন শেখালো, তাদের সাথে ভালো দোভাষী দিয়ে দিল, আর মেহমানরাও সব নিজেদের খরচ করলো, তো এটা হবে সেই রুহানী এস্তেমা, যা ঐ আইয়ুব পয়দা করবে, যার ভিতরে এই জজবা থাকবে যে, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় চলতে গিয়ে পথেই মারা যাই তবে সেখানেই আমাকে দাফন করবে না। যখন কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন আইয়ুব কি নিয়ে এসেছো? তো বলতে পারবো, যখন মদীনায় ছিলাম, তখন হুজুর (সাঃ) এর কথা, তার তালীম, তার জাত, হুজুর (সাঃ) এর মেহমানদারী। কিন্তু যখন হুজুর (সাঃ) এর মেহনতের তাকাজা আসল, বার্ধক্য আর অসুস্থতার অপারগতা, আর লোকজন কুরআন হাদীস শুনিয়ে বুঝাচ্ছে যেন আমি না বের হই। আর‘হালকা-ভারী সর্বাবস্থায় আল্লাহর রাস্তায় বাহির হও’ এই আয়াতের কারণে আমি ঘরে থাকতে পারিনি। আমি তো তোমার রাস্তায় চলেছি, তোমার রাস্তায় মরেছি, আর মৃত্যুর পরে আমার লাশও তোমার রাস্তায় চলেছে।
মেরে ভাইয়ো দোস্ত আজিজো আওর বুজুর্গো!
আমার আপনার আকীদা হযরত মুহাম্মাদ (সা:) এর পরে দুনিয়াতে কোন নবী আসবে না। মুহাম্মাদ (সা:) বলে দিয়ে গেছেন, আমার পরে বড় বড় ফিৎনা হবে। ত্রিশজন দাজ্জাল হবে। এক হল ঐ দাজ্জাল, মানুষ নবুওতের দাবী করবে। যখনি হুজুরে পাক (সা:) এর ওফাত হয়ে গেল মুসাইলামা কাজ্জাব নবী হওয়ার দাবী করে বসল। একটা মেয়ে লোক, সেও নবী হওয়ার দাবী করল। ফিৎনা হবে। যেমন আজ দুনিয়ার মানুষ বলছে, হায় ফিৎনা! হায় ফিৎনা! হায় ফিৎনা! শুনে রাখো, এই একীনের সাথে মেহনত করতে হবে, নিজেকে এতে খাটাতে হবে যে, প্রত্যেক ফিৎনার চিকিৎসা হল মুহাম্মাদ (সা:) ওয়ালী মেহনত ও দাওয়াত।
হুজুর (সাঃ) এই কাজ কিভাবে শুরু করেছিলেন? তৌহিদ, রিসালাত আর আখেরাত। এই তিন বুনিয়াদি একীন বয়ান করেছেন, মক্কা মুকাররমার তের বছরের জিন্দেগীতে। ঈমানের হাকীকত হাছিলের রাস্তায় হালাত আসবে।
পড়ো জীবনী হযরত আবু জর গিফারী (রা) এর। আর পড়ো সীরাত হযরত বেলাল (রা) এর। পড়ো আবু বকর, ওমর, উসমান আর আলীকে। পড়ো ঐ সমস্ত সাহাবিয়া (রা: আনহা) কে। আর পড়ো তাদের কোলের বাচ্চাদের। প্রত্যেক জায়গায় তিনটি বুনিয়াদ। আল্লাহ এক, হযরত মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহর সত্য রাসূল এবং যে যত লাফালাফি করো, উচ্ছৃঙ্খলতা করো, নাচানাচি এবং বাড়াবাড়ি করো, মরতে হবে, মরতে হবে, মরতে হবে। মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় বার আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তৌহিদ রিসালাত আর আখেরাত।
মক্কা বাসীরা ঈমান আনলোনা। এরা আল্লাহর উপর ঈমান আনল না। মুহাম্মাদ (সাঃ) কে আল্লাহর সত্য নবী হিসাবে মানলোনা। তার হুকুম, তার তালীম, আর অনুগত্য, তার অনুসরণ,তিনিই যে দুনিয়া আখেরাতে রহমত স্বরুপ, এই কথাকে মানত না। তেমনি মানতনা যে মৃত্যুর পরে আবার উঠতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
‘তুমি কি এই মনে করে আছো নাকি যে, খেয়ে দেয়ে ফুর্তি করলাম। তারপর মরে গেলাম আর মাটির সাথে মিশে গেলাম?’
‘আপনি বলে দিন, তারা এতরুপ বলে যে, আমি আবার উঠাতে পারবো না।’
‘না, আমার রবের কসম খেয়ে বলছি। যা যা করে এসেছো। এক এক করে তা তোমাদের সামনে আসবে।’
‘প্রত্যেকের আমলনামা মালা বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’
মক্কা মুকাররমার সমস্ত মোজাহাদা, সমস্ত কষ্ট ক্লেশ, কাঁটা বিছানো হচ্ছে, কোথাও পাগল বলা হচ্ছে। থুথু দেয়া হচ্ছে। কোথাও গলায় ফাঁস লাগানো হচ্ছে। কোথাও জাদুকর ও কবি বলা হচ্ছে। হুজুরকে, হুজুরের অনুসারীদেরকে, জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে, উত্তপ্ত বালির উপরে, তিন তিন শিফট করে বেলালকে উমাইয়া বিন খলফ, দুর্ভাগা, বড় ব্যবসায়ী ছিল। বড় কারবার ছিল, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি আসত শাম দেশ থেকে। কসম খেয়েছিল যে, ওর পুরো জান, পুরো মাল, পুরো শক্তি, বুদ্ধি, সমস্ত মালের পাইপাই দিয়ে পুরো জিন্দেগী ব্যয় করবে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে, তার দাওয়াতের বাঁধা দেয়ার পথে, তার কথা, তার কাজ, তার আমল, তার এলেম, তার মেহনতে বাধা দেয়ার পথে ব্যয় করবে।
সে হযরত বেলাল (রা) কে কিনেছিল। সে বলল, কি? তুমি নবীর মতে মত দাও? নবীর দাওয়াতকে গ্রহণ করেছ? তুমি বল যে আমার তো ভাগ্য খুলে গেছে? তো শুরু হলো নির্যাতন। সূর্য ওঠা থেকে নিয়ে সূর্য গরম হওয়া পর্যন্ত, শরীরের তেল ঝরা পর্যন্ত। ঐ শিফটে যত লোক ছিল সবার কাজ ছিল, বেলালকে কাঁটা ও সুঁই দিয়ে কষ্ট দেয়া। শিফট বদলে গেল। দ্বিতীয় শিফট ওয়ালা আসল। তার কাজ ছিল বেলালকে বস্ত্রহীন করে উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে দিয়ে টানা হেচড়া করা তৃতীয় শিফট আসা পর্যন্ত। আর তৃতীয় শিফট শুরু হতো সূর্যাস্তের পর। তাদের কাজ ছিল সারা রাত চাবুক মারা। মারতে থাকা, পিঠে লাগে, কমরে লাগে, ডানে লাগে, বামে লাগে। এই দুর্ভাগ্য কেন?
তোমরা বিভিন্ন শ্রেণী থেকে এসেছ। প্রত্যেকের মেহনত ভিন্ন ভিন্ন। তোমাদের বাছাই করা হয়েছে। এ অমুক, সে অমুক, এ এই সে ঐ। প্রত্যেকের মেহনত আলাদা আলাদা। গাস্ত করব,তালীম করব, নামাজ পড়ব, ঈমানের দাওয়াত দেব, মানুষের কটুক্তি, চড়া কড়া কথাকে বরদাস্ত করব। ‘আমি তার জন্য এই রাস্তাকে সহজ করে দেবো।’ মিথ্যা, ধোকা, জুলুম,কঠোরতা, নাপাক ইচ্ছা, নাপাক পরিকল্পনা, নাপাক স্কীম, আল্লাহর বান্দাদের দিয়ে পশুত্বের কাজ করিয়ে নেয়া, এর জন্যও যা পারো করো। আমি রাস্তা সহজ করে দেবো। কিন্তু মরতে হবে, মরতে হবে। সামনে সবার হাশর অপেক্ষা করছে।
তৌহিদ, আল্লাহ এক। তার হাতেই সমস্ত কুদরত। মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহর সত্য নবী। তার আনুগত্যের মধ্যেই দুনিয়া আখিরাতের সুখ শান্তি। আর এই জীবন মাত্র কয়েক দিন। তারপর মরতে হবে আর এই জীবনের হিসাব দিতে হবে। তৌহিদ, রিসালাত ও আখিরাত।
তের বছরের এই সমস্ত মোজাহাদা, এই সমস্ত কষ্ট ক্লেশ। এই তিন বুনিয়াদি একীনকে হাকীকতের সাথে দিলে বসানোর জন্য এতসব মোজাহাদা হয়েছে। মেহনতের তরীকা শেখানো হয়েছে। কালেমা শেখো। কালেমা তখন পূর্ন হবে, যখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হবে। কালেমা শেখো, নিজের আখিরাতকে সামনে রাখো। কেউ দেখুক না দেখুক। কেউ জানুক না জানুক। কারো খবর হোক না হোক। আল্লাহ সর্বশ্রতা, সামি’। সর্বদ্রষ্টা, বাছীর। সর্ব জ্ঞানী, আ’লিম। আর তিনি হালীম। তার হেলেমের, ধৈর্য্যরে কি কোন তুলনা হয়?আর তার ফেরেস্তারা! তারা আল্লাহর তাসবীহ পড়ে। সুবহান, সুবহানাকা ওয়া বিহামদিকা। আল্লাহ তুমিই সব কিছু করো। সব কিছু তুমিই করেছো। জমীনকে তুমি ধ্বসিয়ে ছিলে। জাতি সমূহকে তুমি ধ্বংস করেছ। ফেরাউনকে তুমিই ডুবিয়ে মেরেছো। কারুনকে ধ্বসিয়েছো। কিছরা ও কায়ছারকে পরাজিত করেছো। তোমার কি প্রশংসা করব! কি প্রশংসা করব তোমার ধৈর্য্যের?
তিনি সব জানেন। কে কি বলল। কে কি করল। কে কার হক মারলো। কে জুলুম করলো, কে ইজ্জতের উপর আঘাত করল, কে বাবা-মাকে কাঁদালো, কে বিবি বাচ্চার সাথে কি করলো,সব জানেন।
কি বলবো আল্লাহ তোমার ক্ষমার কথা! কত বড় বড় পাপীকে, কত বড় বড় অপরাধীকে, কেমন সব গুনাহগারকে মাফ করে থাকো। এই জন্য আমরা হযরত রাসূলে পাক (সা:) এর নিকট থেকে সবচেয়ে বড় পুরস্কার যেটা পেয়েছি, কাজ করতে হবে, কাজ করতে হবে তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাতের বুনিয়াদকে বানিয়ে। জান নিজের, মাল নিজের, এই রাস্তার মোজাহাদা আর সমস্যাকে, কষ্ট ক্লেশকে সহ্য করে, আর প্রত্যেকের হক আদায় করা, সবর করা, প্রত্যেককে এর জন্য তৈরী করা, প্রত্যেককে আল্লাহর রাস্তার নকল হরকতকে বুঝানো।
লেগে থাকো, চলতে থাকো। এই জন্য এনামুল হাসান সাহেব (রহ:) বলতেন, “আরে আমাদের এই মেহনত তো খুব সহজ। খুব সহজ। কেন? কারন এখানে যা কিছু নেয়ার তা শুধু আখেরাতে আল্লাহর নিকট থেকেই নেয়া হবে। আল্লাহ কে? প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার, খাজানা আছে তার কাছে। নিয়ে নাও তোমার বন্দেগীর জন্য। তো উনি বলতেন, কাজ তো বড় সহজ। আখেরাতের প্রতি নজর থাকবে।
তবে হ্যাঁ যখন সমস্যা সৃষ্টি হয়, যখন কোন মাছলা চলে আসে, আর কাজ করনে ওয়ালা আপোষে ঝগড়া শুরু করে দেয়। যখন নফছ আর নফসানিয়াত, আগ্রাসন, দুনিয়ার তলব,স্বার্থপরতা, যখন এই সব চলে আসে তখন কাজ আর কাজ থাকে না। সব এখানেই উসুল করার, জমা করার ফিকিরে পড়ে যায়।
মেরে ভাইয়ো, দোস্ত, আযীজো আওর বুযুর্গো!
আর এই কথা আমি প্রথমেও বলেছি যে, নবুওতের মধ্যে আর ফিলোসফির মধ্যে পার্থক্য, নবী যা চায় এবং যা কিছু উম্মতের মধ্যে দেখতে চায়। সর্ব প্রথম আমলী নমুনা হল নবী। যেরকম নামায নবী উম্মতের মধ্যে দেখতে চান, ঐ রকম নামায নবী নিজে পড়ে দেখিয়েছেন। যে ঈমানের দাওয়াত নবী দিচ্ছেন ঐ ঈমানের নমুনা নবী পেশ করেছেন। আর যে আখেরাতের খবর প্রত্যেককে দিচ্ছেন, নিজের ব্যাপারে বলেছেন, কি বলেছেন? জিবরাঈল (আ:) তাশরীফ নিয়ে আসছেন। হুজুর নিজের চাচাতো ভাই ফজল ইবনে আব্বাস (রা:) কে বলছেন, ফজল, লোকদেরকে মসজিদে জমা কর। লোকজন জমা হল। তারপর তিনি বললেন, হে লোক সকল! আমার দুনিয়া থেকে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। যদি তোমাদের কারো কোন হক আমার কাছে থাকে তবে সে এখানেই তা নিয়ে নাও। আখেরাতের মাছলা খুব কঠিন। তখন কোন লোক এই কথা বলে নাই যে, আরে তাকে তো আমরা কিছু বলতেই পারি না। সে তো আমাদেরকে কিছু বলতেই দেয় না। না এই কথা হুজুর (সা:) এর ব্যাপারে ছিল, না হুজুরের কোন খলিফার ব্যাপারে ছিল।
হযরত ওমর (রা:) মিম্বরে ছিলেন। তিনি বললেন, শোন এবং মান্য করো। এক সাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন। ‘শুনব না। মানব না।’ ভাই কি হয়েছে? কেন শুনবে না। কেন মানবে না?সবার ভাগে একটা চাদর, আর আপনার কাছে দুই চাদর? এখানে কি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে? পুলিশের লোকও তো কিছু বলতে পারে না। তোমার বেতন তো মাত্র এত। এই মসজিদ কোত্থেকে? এই অট্টালিকা কিভাবে? কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে?
হায় হায়! এই দাওয়াত! যখন দাওয়াতকে দাওয়াতের তরীকায় করবো। আল্লাহতায়ালা আমাদের আকাবীরদের কবরকে নূরে ভরে দিন। পুরো জীবনের ইতিহাস, কুরআন, হাদীস ও সুন্নতের আলোকে। যে ধরন, যে তরীকা, যে উসূল, যে কোরবানী, যে এখলাছ, যে একাগ্রতা আর আখেরাতকে সামনে রেখে, আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হয়ে যায়, মুহাম্মাদ (স:) এর প্রতিটা আচার ব্যবহার, আর প্রতিটা সুন্নত প্রত্যেক ঘরে পৌঁছে যায়। এটাকে সামনে রেখে মেহনতের আদব ও তরীকা মত করা। তারা এমন ছিলেন যে, কারো প্রতি আঙ্গুল উঠানোর প্রয়োজন ছিল না। দাওয়াত তো এমন হবে। যদি দাওয়াত এভাবে না হয় তবে এই দাওয়াতের দ্বারা তরবীয়ত কিভাবে হবে!
এই ওমর (রা:) তো সেই ওমর। তার মেজাজ কেমন ছিল? মক্কার যে কোন গলি দিয়ে যেত তো খবর হয়ে যেত। আর এই কথা তো প্রসিদ্ধ ছিল যে, ওমর মক্কার শয়তানদের মধ্যে একটা শয়তান। এমন কি একজন বুড়ি হিযরত করে যাচ্ছিল, রাস্তায় ওমর এর সাথে দেখা হলো। কোথায় যাচ্ছ? কি করব, তুমি তো আমাদের কাজ করতে দাও না। আমাদের প্রতিটা পদে পদে শুধু বাঁধা দাও। কেন কি হল? আমি তো চলে যাচ্ছি। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করুক। ওমরকে দোয়া দিল। পুরো মক্কায় খবর ছড়িয়ে গেল। আজকের তাজা খবর। লোক যেমন বলে না? সবাই অবাক। ওমরকে দোয়া দিয়েছে। ওমর বলছে, শোন! তোমাকে যদি কেউ এসে বলে যে, ওমরের বাপ খাত্তাব মুসলমান হয়ে গেছে, তবে তার কথা বিশ্বাস করবে। কিন্তু আমার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যাও। আমি তো মুসলমান হবো না। যার এই অবস্থা, দাওয়াতের দ্বারা তার কেমন পরিবর্তন হলো! দাওয়াত ব্যবহারে পরিবর্তন আনে, পশুকে মানুষে পরিণত করে। কিন্তু দাওয়াতের মত দাওয়াত হতে হবে।
এই জন্য মওলানা ইলিয়াস সাহেব (রহ:) বলতেন, দাওয়াতে যত আমল আছে, সেগুলোতে আজও ইয়াকীন এবং পুরো জীবনের পরিবর্তনের শক্তি তেমনি আছে, যেমন মুহাম্মাদ (সা) এর জামানাতে ছিল। আর তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন লেবু নবীর জামানায় পানিতে মেশালে পানি টক হয়ে যেত। পনের বছর হয়ে গেল। ঐ লেবুর তাছীর আল্লাহ তায়ালা আজও বাকী রেখেছেন। সে কোন রিক্সাওয়ালাকে ছাড়েনি। স্টেশনের কুলিকে ছাড়েনি। কোন প্রফেসরকে ছাড়েনি। আল্লাহওয়ালাকে ছাড়েনি। কাউকেই ছাড়েনি। সবার কাছে লেবুর একই তাছীর। যদি লেবুর তাছীর, প্রভাব পরিবর্তন না হয়, তবে মুহাম্মাদ (সা) এর জামানার ঈমানের দাওয়াতের তাছীর, তালীমের হালকার তাছীর, জিকিরের হালকার তাছীর, আল্লাহ নামের জিকিরের তাছীর একটুও বদলায়নি। এটা দাওয়াতের আমল। হ্যাঁ, লেবু কাউকে ছাড়ে না। কিন্তু ঘরে তো লেবু থাকতে হবে। খুব সুন্দর কলা, খুব সুন্দর ফল। খুব সুন্দর আনার। ছেলে বাবাকে বলছে, বাবা আমি এটা নেই? বাবা বলছে এটা তো তুমি খেতে পারবে না। এই সবের স্বাদ তো একই রকম। এগুলো প্লাস্টিকের। একজন দশজন নয়, হাজার নয়, লক্ষ নয়, কোটি নয়, সারা বাংলাদেশ মিলে চেষ্টা করলেও এক ফোঁটা রসও বের করতে পারবে না। কারণ রস তো এতে নেই। এটা তো শুধু দেখার জন্য।
আল্লাহ কসম দাওয়াত এখনো তার তাছীরের সাথে আছে। দাওয়াতের আমলসমূহ এখনো তার তাছীরের সাথে আছে। যখন মানুষ একিন কে পরিবর্তন করবে, আল্লাহর ভয়কে পয়দা করবে, তার আজমত দিলে বসাবে।
এ তো সেই ওমর, যে তার বোনকে কেমন পিটালো! কিন্তু দাওয়াত তার তাছীরকে প্রকাশ করে। বলা হয় ঘরের তা’লীম, ঘরের তা’লীম, এটা ঐ তা’লীমের তাছীর। এ তো সেই ওমর,হাতে এখনও তলোয়ার আছে। দুচোখে আক্রোশ। পুরস্কার তো আমিই নিব। কিন্তু দাওয়াত তার তাছীর প্রকাশ করে। এক ঝটকায় সব বদলে ফেলে। এসেছিল জীবন নিতে, এখন নিজের জীবনকে এসে পেশ করছে- ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।’
এ জন্য দাওয়াত যখন মুজাহাদার সাথে হবে। কোরবানীর সাথে হবে। যখন দাওয়াত সব রকমের বিদ্বেষ আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়ে যে কোন ব্যক্তি যে কোন সময়ে, যে কোন জায়গায় এই মেহনতকে করবে। আজ নয়, আল্লাহতায়ালা কেয়ামত পর্যন্ত এর আছর রেখেছেন।
ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, এই দুই চাদর, এটা কিভাবে পেলেন? সবাই তো একটা পেয়েছে। হয়রত ওমর (রা:) রেগে যাননি। ‘বেয়াদব! মজমার ভিতরে এই ধরনের কথা বলে? সবার সামনে।’ তাকে কিছুই বলা হল না। হযরত মাওলানা ইলিয়াস সাহেব (রহ:) এই কথা খুব বলতেন। আমাদের এই কাজ হুজুর পাক (সা:) এর সীরাত অনুযায়ী, সাহাবা (রা:) দের সীরাত অনুযায়ী হবে। তখন এর তাছীর থাকবে, সৌন্দর্য থাকবে। মেহনতে তরক্কী হবে। কাজ করনেওয়ালাদের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হবে।
হযরত ওমর (রা:) বড়ই লজ্জার সাথে বললেন, মজমায় কি আব্দুল্লাহ আছো? আমার ছেলেকে ডাকো, ‘জ্বী আব্বা, আমি আছি।’ ‘আরে ইনি যেটা বলছেন, তার উত্তর দাও।’ বাপও আছে। ছেলেও আছে। দরবারে-রেসালাত থেকে সবারই তরবীয়ত হয়েছে। দাওয়াতের মধ্যে তরবীয়ত আছে। আল্লাহ তা’য়ালা হুজুর (স:) এর কবরকে নূরে ভরে দিন। দাওয়াতের পুরো তরীকা, উসূল, আদাব বয়ান করে গেছেন।
‘জ্বী আব্বা?’ ‘আরে এর কথার জওয়াব দাও।’ শাহেবজাদা বলতে পারতো, আরে কোথাকার কে এই লোক? বের হও এখান থেকে। তুই এই বলেছিস? এই বলেছিস? আব্বার ব্যাপারে তাহকীক করছিস? আব্বার সামনেই তাহকীক করিস? কে এই লোক? বের করে দাও একে এখান থেকে। তুই এই কথা বললি? না। বরং হযরত আব্দুল্লাহ (রা:) বললেন হা ভাই কথার তো যুক্তি আছে। আর তোমার প্রশ্ন করার হক আছে। আসলে ব্যাপার হলো এই, আমীরুল মোমেনীন এর ভাগেও একটাই চাদর এসেছিল। এই উপরের যে চাদরটা এটা তো আমার ভাগের। আমি তাকে দিয়ে দিয়েছি। ঐ লোক আবার দাঁড়িয়ে গেল। বলল, এখন বলেন! আমরা শুনবও মাকবও। তাদের তবীয়তের মধ্যে হিংসা আর বিদ্বেষ ছিল না। প্রকৃত অবস্থা সামনে এসে গেছে তো মেনে নাও। না আমি মানতে পারবো না, এই রকম ছিলনা। এই তবীয়তের রাস্তা ছিল মুহাম্মাদ (সা:) এর। যিনি বুনিয়াদ তৈরী করেছিলেন তৌহিদ,রিসালাত,আর আখেরাতের।
হযরত মুহাম্মাদ (সা:) মসজিদে তাশরীফ নিয়ে এসেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) মসজিদে লোকদের সমবেত করলেন। হুজুর (সা:) মিম্বরে উঠে এই কথা বললেন, লোক সকল! আমার এখন তোমাদের থেকে বিদায় নেয়ার সময় খুবই নিকটবর্তী। কারো যদি কোন হক আমার উপর থেকে থাকে সে আমার থেকে তা নিয়ে নাও। কেননা হুজুর (সা:) নিজেই বলছিলেন সাহাবাদেরকে, বলতো নিঃস্ব কে? সাহাবারা বললেন যার কাছে টাকা পয়সা কিছুই নেই সেই নিঃস্ব। তারপর হুজুর (সা:) নিজেই উত্তর দিলেন, না, এত তাবলীগ, এত নামায, এত রোজা, এত কুরআন, এত জিকির, এত তাছবীহ, এত তালীম, এত উমরা, এত হজ্ব সব নিয়ে যাবে। একে চড় দিয়েছিলে? একে গালি দিয়েছিলে? ওলামায়ে কেরামকে আল্লাহ তায়ালা জাযায়ে খায়ের দান করেন। প্রশ্ন এল, এ তো চড় দেয়নি বরং অমুক এর দ্বারা চড় মারিয়ে নিয়েছিল। ওলামায়ে কেরাম বলেন, প্রকৃত অপরাধী ঐ ব্যক্তি, যার হুকুমে এ চড় মেরেছে। একে আখেরাতে জবাব দিতে হবে।
তো হুজুর (সা:) এই কথা বললেন। কারো কোন হক আছে কিনা। এক সাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন। হে আল্লাহর রাসূল! অমুক সময় আমার নিকট থেকে খেজুর নিয়ে অমুককে দিয়েছিলেন। হুজুর (সা:) বললেন, হ্যা ভাই ফজল, তাকে খেজুর দিয়ে দাও। তারপর বললেন আর কেউ আছে কোন হকদার? একজন সাহাবী দাঁড়ালেন, রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন। ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আমাকে একদিন পিঠে চড় মেরেছিলেন। হুজুর (সা:) বললেন তাহলে তুমি এখন এর প্রতিশোধ নিয়ে নাও। ঐ সাহাবী বললেন, আপনি যখন আমাকে মেরেছিলেন তখন আমার গায়ে কাপড় ছিল না। আর আপনি তো এখন চাদর পরে আছেন।
কে এই কথা বলছে? কাকে বলছে? দাওয়াত তখন দাওয়াত হবে। ঈমান তখন ঈমান হবে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তখন হবে। আখেরাত তখন বনবে। যখন মুহাম্মাদ (সা:) এর পুঙ্খানুপুঙ্খ পদানুসরণ করবো। হুজুর (সা:) এর আনুগত্য করবো।
নাও ভাই, বদলা নিয়ে নাও। আমিও চাদর খুলে নিলাম। তারপর ঐ সাহাবী এগিয়ে আসেন। আর ঐ সাহাবী বড় বুদ্ধিমান ছিলেন। যেমন হযরত সালমান ফারসী (রা:) এসেছিলেন। অনেক পাদ্রীর কাছে থেকে তারপর এসেছেন। যখন শেষ পাদ্রীর কাছে ছিলেন, তো জিজ্ঞেস করেছিলেন সালমান ফারসী (রা:), আপনি মারা গেলে তারপর কার কাছে যাব? বললেন,ঐ নবী যার আগমনের সুসংবাদ প্রত্যেক নবী দিয়ে গেছেন। ঐ নবীর আসার সময় হয়ে গেছে। আর উনি আরবে আসবেন। সালমান (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন তার কিছু আলামত বলেন,কিভাবে চিনব? পাদ্রী বললেন, ৩ টি আলামত হবে। সদকা খাবে না, হাদিয়া গ্রহণ করবে। আর তার পিঠে কবুতরের ডিমের মত মোহরে নবুওত থাকবে।
আর এটা মনে রেখো, যে যত বেশী খারাপের মধ্যে থাক, যে যত নোংরামীর মধ্যেই থাক না কেন, যে যত ঈমানের বিপরীত কার্যকলাপে লিপ্ত থাক, যে যত অনর্থক ও বেহুদা কাজের মধ্যে থাক, কিন্তু যখন হকের তলবে লেগে যায়, সত্যের পিপাসায় কাতর হয়, আল্লাহ তার পিপাসাকে দূর করে দেয়, থলেকে ভরে দেয়। সালমান এসেছে, এক কাফেলা পেয়ে গেল। এখানে যেমন কত কাফেলা এসেছে। কি ভাই তোমরা কোথায় যাবে? বাংলাদেশে যাব। কেন? সেখানে কোন মেলা বসেনি। সেখান থেকে চিল্লায় বের হব। সেখানে তো পুরো জিন্দেগীর পরিবর্তন হবে। সেখানে তো শানদার নামাজের জন্য যাবো। সেখানে তো নয়ন ভরা জল হাসিলের জন্য যাচ্ছি। ভাই তাহলে সেখানে আমিও যাবো। আমিও নবীওয়ালা কাজ শিখতে যাবো। আমি সবার কাজ করেছি, শুধু নবীর কাজই করিনি। তো সালমান তাদের জিজ্ঞেস করল। তারা বলল ভাই আমরা তো আরবে যাচ্ছি। সালমান তার পথ-সম্বল যা ছিল,ওদেরকে দিয়ে বলল আমিও আরবে যাবো, আমাকে নিয়ে চলো। অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর তারা সালমানকে বিক্রি করে দিলো। মদীনার ইহুদীরা কিনে নিল। আর দিনে ১২ ঘন্টা ১৬ ঘন্টা খাটিয়ে নিতো। ঐ বাগানে পানি দিতে হবে। ঐ বাগানে ফল পেকেছে। সেটা পারতে হবে। একদিন তিনি গাছে উঠেছেন খেজুর পারতে। নিচে বাগানের মালিক ছিলো। তার চাচাতো ভাই এসে বলছে, সর্বনাশ হোক? কেন কি হল? আরে এক লোক এসেছে, সে বলছে, সে নাকি আল্লাহর রাসূল। ওদিকে গাছ থেকে সালমান এটা শুনে নেমে এসেছে। মনে মনে খুশিতে বলছে, আরে তুই ঠিক জায়গাতেই এসে পৌঁছেছিস। বাগানের মালিককে সালমান বলল, আমাকে কিছু সময়ের জন্য ছুটি দেন। তারা বলল, না, কোন ছুটি নেই। কাজ কর। পরে অবসর বের করে সালমান গেল রাসূল (সাঃ) এর দরবারে। কিছু খেজুর নিয়ে গেল। গিয়ে বলল, আমি একজন মুসাফির। আপনার জন্য ছদকা এনেছি। এগুলো নিন। রাসূল (সাঃ) বললেন, ভাই আল্লাহ তোমর উপর রহম করুন। আমরা তো ছদকার মাল খাই না। একটা আলামত প্রমাণ হয়ে গেল। এবার সালমান বলল, এই খেজুর গুলো আপনার জন্য হাদিয়া। রাসূল (সাঃ) বললেন, তুমি মুসাফির, ভাল মানুষ বলেই তো মনে হচ্ছে। হাদিয়া গ্রহণ করতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। দ্বিতীয় আলামতও পেয়ে গেলেন। এবার তৃতীয় আলামত নবুওতের মোহর। এটা কিভাবে দেখবেন?
মনে রেখো, যখন কেউ আল্লাহর জন্য কুরবানি করে, মোজাহাদা করে, তখন আল্লাহ পাক তার গায়েবি নেজামকে চালু করেন। সবাই বসে আছে সামনে। সালমান গিয়ে বসল পেছনে। আল্লাহর গায়েবি নেজাম শুরু হয়ে গেল। চাদর সরে গেল, আর মোহরে নবুওত চোখে পড়ল। সাথে সাথে তিনি কালেমা পড়ে নিলেন। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্নাকা রাসুলুল্লাহ।
এই লোক তো নতুন। নাজানি কোত্থেকে এসেছে। একে কিছু জিজ্ঞেস করো না। এর রায় নিও না। না, এই রকম কথা কেউ বললেন না। বরং খন্দকের যুদ্ধে ফেরেস্তাদের অবতরণ। কাফেরদের মোকাবেলায় আল্লাহর গায়েবী সাহায্য। এই পুরো যুদ্ধের নায়ক ছিলেন এই সালমান (রা:)। যুদ্ধের বুনিয়াদ ছিলেন। অথচ তার দেশ ভিন্ন ছিল, ভাষা ভিন্ন ছিল। কিন্তু সেখানে আসাবিয়াতের, সাম্প্রদায়িকতা বা স্বজনপ্রীতির নাম ও নিশানাই ছিল না। বরং বললেন ‘সালমান আমাদের পরিবারভুক্ত।’
সীরাতের আলোকে, তাদের জীবনাদর্শ থেকে এই কাজ করতে হবে। বদরযুদ্ধ, ওহুদ, খন্দক, তবুক সব যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) সাহাবীদের সাথে ছিলেন। সবাই একটা পাথর বেঁধেছেন তো তিনি দুইটা বেঁধেছেন।
বদলা নাও। আসো আমার পিঠে চড় মারো। ঐ সাহাবী এসে ঐ মোহরে নবুওতে চুমু খেলেন। সেখান থেকে ফারেগ হয়ে ঐ রাতে রাসূল (সাঃ) তার বিবিগণের নিকট তাশরীফ নিয়ে গেলেন। বললেন, তোমাদের থেকে আমার পৃথক হওয়ার সময় খুব ঘনিয়ে এসেছে। যার যে হক আমার উপর আছে, সে তা নিয়ে নাও।
এটা হল তাদের জীবন, এই রকম তাদের জীবন। যে যত বেশি পুরানা, যে যত জিম্মাদার, যে যত বড়, তার আখেরাতের ফিকির তত বেশি হবে। সবচেয়ে বড় আমাদের সর্দার,মদীনার চাঁদ রাসূলে কারীম (সাঃ)। এই জন্য তাকে বলা হচ্ছে, তুমি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি জাননেওয়ালা এবং সবচেয়ে বেশি ভয় করনেওয়ালাও।
দাওয়াত তার আছর ঠিকই প্রকাশ করে থাকে। হুজুর (সাঃ) আবু জেহেলের ঘরে দাওয়াত নিয়ে যেতেন। সূর্যের কিরণ যেমন কতশত বস্তুর উপর গিয়ে পড়ে। মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার সাহাবীদের কিরণ আবু জেহেলের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করল, আর একরামা (রাঃ) এর উপর গিয়ে পড়ল। তো দাওয়াত তার তাছীর দেখাবেই। যে, কলিজা চিবানে ওয়ালী হেদায়েত পেয়ে গেল।
আর হিন্দা তখনও ইতমিনান হতে পারেনি। এমনকি যখন হিন্দা আসল। পুরো মক্কায় খুঁজছে। কোথায় গেল? সে তো কা’বায়, তেলাওয়াত করছে। মাকামে ইবরাহীমীতে নামাজ পড়ছে। দোয়া করছে আর কান্নাকাটি করছে। ‘ও বুঝতে পেরেছি। সে তো আমাদেরকেই বদ দু’আ করছে বুঝি। একটু গিয়ে লুকিয়ে শুনি তার বদ দু’আ।’ তারপর যখন আসলো,অন্ধকার হয়ে গেছে। অন্ধকারে লুকিয়ে শুনছেন। ‘আল্লাহ তুমি মক্কার প্রতিটা মানুষকে হেদায়েত দাও।’ আচ্ছা, এর অন্তরে এত দরদ? এত প্রশস্ততা! কলিজা চাকনেওয়ালী, রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে যাচ্ছে। নাক-কান কেটে মালা বানিয়ে যে গলায় পড়তো, সেই হিন্দা রাযিয়াল্লাহু আনহা হচ্ছে।
দাওয়াত নিজের তাছীর না দেখিয়ে থাকতে পারে না। যদি দাওয়াত ছহীহ উসূলের সাথে, সঠিক পদ্ধতিতে, আকাবিরদের বাতলানো তরীকায়, দাওয়াত কুরবানির সাথে এবং শুধু এবং শুধুমাত্র আল্লাহর রেজামন্দির সাথে হয়।
এখন আমার ভাইয়ো দোস্ত আযিযো আর বুযুর্গো !
আজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বানিয়েছেন। এর মধ্যে পশুত্ব, ফেরেসতাসুলভ ব্যবহার, মনুষ্যত্ব, শয়তানী সব দিয়েছেন। এ যদি জানোয়ার হতে চায়, হিং¯্র হতে চায়, বিষাক্ত সাপও হতে পারে, অথবা বিচ্ছুও হতে পারে। সোজা একটা মানুষ চিড়ে, ফাঁড়ে, তার রক্ত প্রবাহিত করে দেয়, এমন কুত্তা, এমন চিতা,আর শকুনও হতে পারে।
আর যদি এই মানুষ আল্লাহর আনুগত্য করতে করতে, নিজেকে ফেরেস্তার মত বানাতে চায়, কারো সাথে কোন লেনদেন নাই, আমার তো আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, তাকে মানতে হবে। ফেরেস্তার মত সিফাতকে অর্জন করতে চায় তো করতে পারবে। এ যদি আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গীন হতে চায়, আল্লাহর খলীফা, আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে যদি চায় এবং সমস্ত নবীদের সর্দার মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নায়েব হিসেবে এক এক জন মানুষের জন্য দরদ নিয়ে, মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রতিটি উম্মতকে মহব্বত করতে করতে, যদি সে নবীওয়ালা রঙ্গে রঙ্গীন হতে চায়,হতে পারবে। মেহনতের চারটি নিসবত। এই চার নিসবতের যে কোন লাইনে সে মেহনত করবে সে এটাই বনবে। এ যদি পশুত্বকে অর্জন করে তবে সে মানুষের মহল্লায় বসবাসরত একটা ছাগল। মানুষের শহরের একটা নেকড়ে, একটা চিতা। এ একটা বিষাক্ত বিচ্ছু মানুষের ছদ্ধবেশে। এর এই পুশুত্বকে বর্জন করে ফেরেস্তার সিফাত হাসিলের জন্য এই রোজা,নামাজ, ঈমানের সাথে পশুত্বকে দমন করতে থাকবে, আল্লাহর রাস্তার নকল হরকতের সাথে। যখন তাকাজা আসবে, জান হাজির, মাল হাজির, জজবা হাজির, কারো সাথে কোন লেনদেন নাই।
প্রত্যেকের জন্য কোমলতা, প্রত্যেকের জন্য উত্তম জজবা আর নবীওয়ালী দু’আ, উম্মতের দরদ। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হুজুর (সাঃ) বলেছেন, যে দু’আ আমি সারা জীবনে তোমার জন্য একবার মাত্র করেছি, ঐ দোয়া তো আমি প্রত্যেক নামাযের পর আমার উম্মতের জন্য করি। মুহাম্মাদ (সা:) ওয়ালা চিন্তা, এটা হাসিলের জন্য প্রত্যেককে মেহনত দেয়া হয়েছে। এই জন্যই এই এস্তেমা হচ্ছে। এখন আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে পশুত্ব থেকে বের হয়ে, ফেরেস্তাদের সীফতকে অর্জন করে, আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গীন হয়ে,নবীর কাজকে কাজ বানিয়ে নবীর চিন্তাকে নিজের চিন্তা বানিয়ে, নবীর মত আখলাকের সাথে, যার জিন্দেগীর যত দিন বাকী আছে, কিন্তু আজকে আমাকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সাহাবীদের জামাত মদীনাতে। এক জামাত ছিল, যারা পুরা জান পুরা মাল, এক জামাত ছিল যারা আধা জান, আধা মাল, আর সর্বশেষ স্তরে যারা ছিল তারা প্রত্যেক বছর চার মাস আল্লাহর রাস্তায় লাগাতো। আর যারা আসতো তাদের নুসরত, খেদমত, শেখা, শেখানো এটা ছিল মুহাম্মদ (সা:) এর সাহাবীদের মেহনতের নকশা।
আমাদের আজকে আল্লাহর বান্দা, রাসূল (সা:) এর নায়েব বনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর জন্য আমার পশুত্বের তাকাজাকে কুরবানি করতে হবে। দমন করতে হবে। আর রাতের কান্নাকাটি, আল্লাহর যিকির, কুরআনের তেলাওয়াত, ইনফিরাদী আ’মাল করতে করতে এই মেহনত করব। পুরা দুনিয়ার নিয়ত করতে হবে।
আল্লাহ আমাকেও কবুল করুক। তোমাদেরকেও কবুল করুক। আর হিম্মত করে বলো, কে কে তৈরী আছো?
নিয়ত করে নাও। এই কাজকে কাজ বানাবো। নবীর কাজকে নিজের কাজ বানাবো। আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন হবো। যেকোন হালতে অটল থাকবো। নিজেকে আল্লাহর খাঁটি বান্দা বানাবো। দেখ! কাল এ মজমা এখানে থাকবে না। আজকে রাতে যত কাঁদতে পারো। আল্লাহকে যত পারো রাজি করাতে। পুরা দুনিয়াতে হিদায়াতের ফয়সালা করিয়ে নিতে পারো।
অডিও