হযরত মাওলানা সা’দ সাহেব (দা.বা.) এর বয়ান
২০১৪ টঙ্গি ইজতেমায় জিম্মাদার সাথীদের মধ্যে
হযরত মাওলানা সা’দ সাহেব (দা.বা.) এর বয়ান
الحمد لله وحه والصلوة والسلام على من لا نبى بعده، اللهم صل على سيدنا مولانا محمد وعلى ال سيدنا مولانا محمد- كما صليت على ابراهيم وعلى ال ابراهيم- انك حميد مجيد- اما بعد- فاعوذ بالله من الشيطان الرجيم- بسم الله الرحمن الرحيم- فبما رحمة من الله لنت لهم ولو كنت فظا غليظ القلب لانفضوا من حولك فاعف عنهم واستغفر لهم وشاورهم فى الامر فإذا عزمت فتوكل على الله إن الله يحب المتوكلين وقال الله عز وجل: وإذابتلى إبراهيم ربه بكلمات فأتمهن قال إني جاعلك للناس إماما قال ومن ذريتى قال لا ينال عهدى الظالمين-
মেরে মোহতারাম দোস্ত, বুজুর্গ, আজিজো !
আমার এই কথা ইয়াকিনী যে, ইসলামের ক্ষতি শুধু মুসলমানের দ্বারাই হবে। ইহুদি, খৃষ্টানদের দ্বারা ইসলামের কোনো ক্ষতি হবে না। যেভাবে ইসলামের ক্ষতি শুধুমাত্র মুসলামানদের হাতেই হবে সেভাবে এই দাওয়াতের কাজের ক্ষতিও শুধুমাত্র দাওয়াতের কাজ করনেওয়ালাদের দ্বারাই হবে। বাতিল এই দাওয়াতের কাজের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। যে সব মেহনতকারী মনে করেন যে, দেশে এবং বিদেশে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্য হুকুমত দায়ী, তারা অনেক ধোঁকার ভিতরে আছেন। মেহনতকারীদের আপোষে এখতেলাফের প্রভাব সমগ্র দুনিয়াকে তছনছ করে রেখেছে। যতগুলো ইসলামি দেশে আজ অস্থিতিকর অবস্থা বিরাজ করছে সেগুলোর মূল কারণ আল্লাহর কসম আমি আর আপনি ছাড়া কেউ না। এই কথাগুলো আমি ইয়াকিনের সাথে বলছি।
যদি একজন জিম্মাদারের নিয়তের পরিবর্তনের কারণে ফল বাগানের ফলের রস টক হতে পারে, তবে এমন ব্যক্তি যাদের গোটা বিশ্বের জিম্মাদার মনে করা হয়, তাদের নিয়তের প্রভাব পুরো দুনিয়াতে কী পরিমান পড়বে তা আমাদের চিন্তা করার বিষয়।
সাথিরা দোয়ার জন্য বলল, যে বাংলাদেশের হালাত তো এমন ! আমি বললাম হালাত? এই হালাততো আমাদের কারণেই। নতুবা এমন একটি দেশ যার বুনিয়াদ ইসলামের উপর, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইজতেমা হয়। যেই ইজতেমার উদ্দেশ্য দাওয়াত আর দ্বীন, সেই দেশে এমন হালাত আসলো! আল্লাহর কসম! এই হালাতের কারণ হুকুমতের সাথে না। এই সমস্ত নিজাম বিগড়ানোর কারণ এখানের কাজ করনেওয়ালা সাথিরা। পত্রিকা পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যে, এই দলের কারণে এমন হয়েছে; ঐ দলের কারনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে; এগুলো ঠিক না। শুধুমাত্র মেহনতকারীদের বিভক্তির কারণে উম্মতের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। আর মেহনতকারীদের ইজতেমায়িয়াতের কারণে উম্মতের মধ্যে ইজতেমায়িয়াত পয়দা হবে। আল্লাহর কসম! এই পরিস্থিতির তৃতীয় কোনো কারণ নেই।
মোহতারাম আজিযো!
হযরতজীর বয়ানাত সাথীদের কাছে শুধু পড়ার জন্য আছে কখনো বয়ানের সামনে আমরা নিজেকে নিজে মিলিয়ে দেখিনি। নিজের উপর নিজে কখনো তোহমত লাগাইনি। যে, আমার কারনে এমন হচ্ছে। তাই বলে আজ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যে, আমার কারনে ক্ষতি হচ্ছে। তাই আমি এই কাজ থেকে দূরে সরে যাই। যদি এই সিদ্ধান্ত সঠিক হত তবে সবাই বেঁচে যেতাম। কিন্তু বাঁচার পথ নেই। কেননা, আল্লাহ তায়ালা যার উপর দ্বীনের কাজের জিম্মাদারী দিয়েছেন, তাঁর কারনে, দ্বীনের অথবা উম্মতের দ্বীনের, জানের, মালের যদি কোনো ক্ষতি হয় তবে আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে কিয়ামতের দিন বিচারে কাঠগোড়ায় দাঁড় কড়িয়ে জবাব দিহি চাইবেন।
স্পষ্টভাবে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্ববান। তোমাদের প্রত্যেককে অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে”। এই জন্য মামলা বাহিরের সাথে সম্পর্কিত না; এইটা সাথীদের গলত চিন্তা মামলা তো কাজ করনেওয়ালাদের সাথে সম্পর্কিত। আমি বলছিলাম, যদি একজন বাগানের জিম্মাদারের খারাপ নিয়তের কারণে বাগানের ফলের রস টক হতে পারে, তবে যে দেশের জিম্মাদার, যার তত্ত্বাবধানে গোটা দেশে দ্বীনের কাজ পরিচালিত হয়, তার নিয়তের খারাবির কারনে পুরো দুনিয়ার উপর কী প্রভাব পড়বে? এই জন্য আমরা প্রত্যেকেই আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে নিজে ক্ববুল করাই।
আমি ক্বসম করে বলতে পারি, এই কাজে আগে বাড়ার ব্যাপারে কাজ করনেওয়ালার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। কারো সাথে সম্পর্কের কারণে না কেউ কাউকে আগে বাড়াতে পারে, না কেউ আগে বাড়াতে পারে। এই কাজ সম্পূর্ণবাবে আল্লাহ তায়ালার।
الله يصطفى من الملائكة رسلا من الناس
আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে বাছাই করেন, নির্বাচন করেন এই কাজ কার থেকে নিবেন। আল্লাহ না করুন; যদি আমার এমন কোনো ভাবনা থাকে যে, আমাকে কেউ আগে বাড়ায়, কেউ আমাকে সমর্থন করে তবে কারও চিন্তায় আমার সমন্ধে এই কথাও আসবে যে, আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হোক। এই কাজে কাউকে আগে বাড়ানো, কাউকে পিছনে রাখার ক্ষমতা আল্লাহ পাক কাউকে দেননি। কুরআনে এর কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। আমি কুরআনের আলোকে এই কথাগুলো বলছি। দ্বীন এবং দাওয়াতের মেহনতে কেউ কাউকে আগে বাড়িয়ে দিবে, কেউ কাউকে পিছনে সরিয়ে দিবে-এই কথা কুরআনের শিক্ষা এবং কুরআনের মূলনীতির খেলাফ। এটি সাথিদের কাছে ধোঁকা। কেন এই ধরনের কথা হয়? যে, অমুক অমুককে পিছিয়ে রেখেছে, অমুককে আগে বাড়িয়ে দিয়েছে; উনি অমুককে কাজে লাগায় নি; ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ধরণের কথা কেন আসে? আল্লাহ তায়ালার কসম! এই ধরনের ভাবনার কারণ এটি ছাড়া আর কিছু না যে, আমার সাথে আল্লাহ পাকের সম্পর্ক কমজোড়। আমি কসম খেয়ে বলছি, এটি ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। কেননা এটি সন্দেহজনক কোনো কথা না। কার সাধ্য যার থেকে আল্লাহ কাজ নিবেন তাকে কেউ রুখে দিবে? কিভাবে সম্ভব যে, যাকে আল্লাহ সম্মানিত করতে চান; তাকে কেউ বাধা দিবে? নবী-রাসুলদেরকে কত প্রতিকুল পরিবেশে পাঠানো হতো! হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশীয় লোকসহ বন্ধু-বান্ধব, আপন-পর কেউ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসুল হিসেবে মেনে নিতে তৈরি না। নবী পাঠানোর পরিবেশ তখন ছিলনা। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নির্বাচন করেন, আর নির্বাচন করেই পাঠান। আমার এই কথাগুলো আপনারা অন্তরে গেঁথে নিবেন, স্মরণ রাখবেন-এই দ্বীনের মেহনতের কাজে কেউ কাউকে সামনেও বাড়াতে পারে না; কেউ কাউকে পিছনেও সরাতে পারে না। কেননা এমন তো হয় রাজনীতির ময়দানে। সেখানে প্রতিদিন কেউ আগে বাড়ে, প্রতিদিন কেউ পিছনে পড়ে; প্রতিদিন উপরে উঠে, প্রতিদিন নিচে নামে। এখানে এমন নয় যে, কেউ কাউকে আগে বাড়ালো, কি পিছে হটালো, কেউ কাউকে কোনো মাকাম দিয়ে দিল, কি মাকাম থেকে হটিয়ে দিল- এটি সহীহ না। হাদিস শরীফে বর্নিত আছে, আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে যখন মহব্বত করেন তখন ফেরেশতাদের মজলিসে সেই বান্দার প্রতি ভালবাসার কথা প্রকাশ করেন। আল্লাহ পাক স্বয়ং এলান করেন- হে ফেরেশতারা! জেনে রাখ; আমি অমুকের পুত্র অমুককে ভালোবাসি, তোমরাও তাকে ভালোবাস। এরপর উপর আসমানের ফেরেশতারা নিচের আসমানের ফেরেশতাদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছিয়ে দেন যে, অমুককে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। তোমরাও তাকে ভালোবাস। এভাবে চলতে থাকে। সর্বশেষ জমিনবাসীদের কাছে ঘোষণা করে দেয়া হয় যে, হে দুনিয়াবাসী! অমুককে আল্লাহ ভালোবাসেন। তোমরাও তাকে ভালোবাস। হাদিসে আছে, জমিনে এই ব্যক্তির মকবুলিয়াতের ফায়সালা করে দেওয়া হয়। এরপর তো খুবই সহজ রাস্তা, নিজেকে সামনে বাড়ানোর জন্য। যে, মাখলুকের খোশামোদ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করে নাও। তাতে আল্লাহ তোমাকে আগে বাড়িয়ে দিবেন। এতে করে কারো প্রতি কোনো শেকায়াত থাকবে না; অভিযোগ, অনুযোগ থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা এমন হালাতের মধ্যে তোমাকে আগে বাড়িয়ে দিবেন যে, মানুষ হয়রান হয়ে যাবে যে, কে এই লোক? কোথা থেকে এলো? কাজেই এই কাজে অগ্রগামী হওয়ার সম্পর্ক মাখলুকের সাথে না। স্বয়ং খালেকের সাথে। কেউ যদি পরীক্ষা করতে চায় যে, আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক কতটুকু? সে যেন দেখে নেয়, বান্দার সাথে তার সম্পর্ক কতটুকু? এই জন্য আমি বলি যে, আল্লাহর কাছে নিজেকে কবুল করিয়ে নাও এটিও স্মরণ রাখা দরকার যে, আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য কাবিলিয়াত বা বাহ্যিক যোগ্যতা শর্ত না। সে জ্ঞান সম্পন্ন কি-না, সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারে কি-না, সম্পদশালী কি-না, পুরনো সাথি কি-না? এগুলো মোটেও কবুল হওয়ার জন্য শর্ত না। আমরা আজ পরখ করি যে, লোকটি তবলিগে কতদিন লাগিয়েছে? অথচ কবুলিয়াতের শর্ত পুরানো হওয়ার সাথে মোটেও না। আমার জানা মতে এমনও সাহাবি রয়েছেন, যারা খুব কমই সময় পেয়েছিলেন কিন্তু মর্যাদার দিক দিয়ে পুরোনোদের চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আল্লাহ পাক উনার থেকে কাজ নিয়ে ছিলেন। পুরোনো হওয়াটা কবুল হওয়ার জন্য শর্ত না। এক ব্যক্তির সুযোগ হয়েছিল যে, উনার জিম্মায় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওহি লেখার জিম্মাদারী ছিল। আসমান থেকে যে ওহি আসত তা তিনি লিখতেন। আমরা মনে করি, আমাদের এখানে মাশোয়ারায় পেশ করনেওয়ালা উনি। আমাদের এখানে ফায়সালা করনেওয়ালা উনি। কিন্তু যে সাহাবি ওহি লিখত উনার মোকাবেলায় আমাদের এই সাথির কি মূল্য আছে? যখন আজ আমার হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাজিল হওয়া কুরআনের উপর এতখানি একিন আছে যে, এর এক একটি আয়াত, এক একটি পারা আল্লাহর নাজিল কৃত, তবে যে সাহাবি স্বচক্ষে দেখেছেন যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ওহি নাযিল হচ্ছে; নিজ হাতে তা লিখছেন; এমন সাহাবির ওহির উপর কেমন দৃঢ় একিন হবে, তা অনুমান করতে পারেন? কিন্তু আল্লাহ তায়ালার এক নিজাম রয়েছে, তা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা কাউকে কোনো দায়িত্ব অর্পন করলে তার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা দেখতে চান, যাকে দায়িত্ব দেয়া হলো সে তার দায়িত্বে কতটুকু যত্নবান, কতটুকু আত্মনিবেদিত। তার মধ্যে আনুগত্যের জযবা কতটুকু? গুরুত্বসহকারে কথাগুলো বুঝতে চেষ্টা করুন। অনেক জরুরী কথা বলছি। আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষা নিতে শুরু করলেন, ঐ ওহি লিখক সাহাবির। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে আয়াত নাযিল করলেন। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির প্রতিটি ধাপকে একে একে বর্ণনা করে শেষ পর্যায়ে বললেন,
فتبارك الله احسن الخالقين
“আল্লাহ তায়ালা কত সুন্দর বানানেওয়ালা।” আল্লাহ তায়ালা এই বাক্যগুলো নাযিল করলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। অন্যদিকে এই আয়াতের অনুরূপ ইলহাম হলো সেই সাহাবির অন্তরে। আল্লাহ তায়ালা দেখতে চাচ্ছেন, ওহি লেখকের মতো মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবির মানার জযবা কতটুকু? তো সেই সাহাবী ইলহাম পেয়ে বলে উঠল আল্লাহ তায়ালা কতসুন্দর বলনেওয়ালা
فتبارك الله احسن الخالقين
এদিকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর একই বাক্য নাযিল হলো। তাই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন, এই বাক্যটিও লিখে নাও। এই ঘটনায় ওহি লিখক সাহাবি মুরতাদ হয়ে গেল এটি বলে যে, আসলে আসমান থেকে ওহি আসে না। বরং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যার কথা ভালো লাগে, তাই তিনি লিখিয়ে রাখেন। আমি এই কথার পরিপেক্ষিতে এই ঘটনা শুনিয়েছি যে, মেহনতকারী পুরোনো হওয়া, কোনো দরজায় পৌঁছে যাওয়া, কোনো যোগ্যতায় পৌঁছে যাওয়ার অর্থ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া না। যে, আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে কবুলিয়াতের শর্ত হচ্ছে মুখলিছ হওয়া। انما يتقبل الله من المتقين আল্লাহ তায়ালা শুধু মুখলিছিনদের আমলই কবুল করে থাকেন; যারা নিজেদের আমল করার ক্ষেত্রে শিরক থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। তুমি যে আল্লাহর জন্য আমল করছ তা আল্লাহ যাচাই করবেন। কিভাবে যাচাই হবে? তুমি মেহনত করতে করতে নুইয়ে পড়বে। অথচ তোমার দিকে কেউ চোখ তুলেও তাকাবে না। কেউ জিজ্ঞেসও করবে না। প্রশংসা করা, খারাপ বলা তো অনেক পরের কথা। মানুষ বলে, ইখলাসের পরীক্ষা আখেরাতে হবে। না, ইখলাছের পরীক্ষা দুনিয়াতেই হবে। দুনিয়াতেই মরার পূর্বে ফায়সালা হয়ে যাবে, মেহনতকারী হয়ে মরণ হচ্ছে না কি অন্যভাবে? ولا تموتن الا وانتم مسلمون এই না যে, মুসলমান হওয়া, না হওয়ার ফয়সালা মৃত্যুর পর হবে। আল্লাহএটিই চান যে, তোমাদের মুত্যু আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে দিয়ে হোক।আমি প্রকাশ্যভাবেই বলছি যে, এই কাজের মধ্যে আগে বাড়ার রাস্তা হলো নিজেকে আল্লাহর কাছে কবুল করানো আর কবুল হওয়ার জন্য কাবিলিয়াত কোনো শর্ত না। পুরনো হওয়াও শর্ত না। এমনকি কারো ডানে-বামে বসার সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আপনাদের আরো ব্যাখ্যা করে বলতে চাই-কারো খেদমত করা, কাউকে হাদিয়া দেয়া, কারো কোনো প্রয়োজন পুরণ করা-এই জন্য যে, সুযোগ পাওয়া যাবে। তিনি বলবেন, এ আমার আমলা (কর্মী)। আল্লাহর কসম! এসব কিছু এই কাজে আগে বাড়ার রাস্তাই না। যারা এমন ধারণা পোষণ করে তারা আল্লাহর কাছ থেকে বিতাড়িত। সে নিজেকে আগে বাড়ানোর জন্য আল্লাহর কাছে কবুল করানোর পরিবর্তে মাখলুকের কাছে কবুল হতে চাচ্ছে। সুহাইল ইবনে আমর, হারিছ ইবনে হিশাম উনারা উভয়ে হযরত উমর রা-এর ডানে-বামে বসা ছিলেন। ঐ সময় হযরত ওমর (রা:) এর কাছে সহজেই পৌঁছা যেত না। মাশোয়ারায় শরিক হতে লোকের সুপারিশে উনার কাছে যাওয়া যেত। যাদের যাওয়ার অনুমতি ছিল লোকরা উনাদের বলতেন, যখন তুমি যাও আমাকে নিয়ে যেও। আমিও তোমার সাথে ভিতরে যাব। এক সময় হযরত ওমর (রা:) একাকী ছিলেন। এমনই এক অবসর মুহুর্তে হযরত সুহাইল ইবনে আমর ও হযরত হারিছ ইবনে হিশাম গিয়ে হযরত ওমর (রা:)-এর দুই পাশে বসলেন। উনারা নিশ্চিত ছিলেন যে, আমরা মোকাম পেয়ে গেছি। এখান থেকে আমরা কোথাও যাব না। আমি আপনাদের বুঝানোর জন্য এই ঘটনা বলছি। কেউ যদি কারো ডান-বাম হয়ে যায় তবে এটি কবুলিয়াতের আলামত না। রাজনীতিতে দেখেন-আজ উনি ডান হাত, উনি বাম হাত। আগামীকাল এই ডান হাত, বাম হাতদের ঠিকানাই জেলখানায় হয়। কোথায় থেকে কোথায় পড়ে যায়? যে লোক অন্যের সাহায্যের আশা করে সে জানাজা (মৃত)। জানাজা যায় অন্যের সাহায্যে। হক কোনো মাধ্যম ছাড়াই নিজ ক্ষমতায় চলতে পারে। কেননা, হক জিন্দা আর বাতিল মুর্দা। কাজেই কোনো ব্যক্তি যদি কারো সহায়তায় সামনে বাড়ে তবে সে মৃত লাশ। তাই তার সাহায্যের প্রয়োজন। যদি জিন্দা হতো তবে কারো সাহয্যের কোনো দরকার ছিল না। যাই হোক। সুহাইল ও হারিছ হযরত ওমর (রা:)-এর পাশে বসা ছিল। কিছুক্ষণ পর আনসার আর মোহাজেররা তাকাজা পুরো করে, মেহনত করে, কুরবানি করে আসা শুরু করল। হযরত উমর (রা:) বললেন, সুহাইল! একটু পিছনে সরে বসো। হারিছ! তুমি একটু পিছনে গিয়ে বসো। একের পর এক সাহাবাকেরাম আসছিলেন। তাতে উনারা দুই জনও পিছনে সরছিলেন। এক পর্যায়ে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় উনাদের কামরার বাইরে যেতে হলো। বাইরে দিয়ে একজন আরেক জনকে বললেন, দেখেছ! আজ আমাদের সাথে কেমন আচরণ হলো? আমরা সবার সামনে বসা ছিলাম। একেবারে উমরের কাছে বসা ছিলাম। উমর আমাদের পিছনে হটাতে হটাতে ঘরের বাইরে নিয়ে এলো। আমীর আমাদের সাথে আজ কেমন ব্যবহার করলেন? অন্যজন বলল, আমীরের উপর কোনো অভিযোগ করে লাভ নেই। আমরা জিম্মাদারকে দোষ দিই। যে, উনি ফয়সাল। উনি আমাকে পিছনে করে দিয়েছেন। উনি আমাকে এখান থেকে উঠিয়ে ওখানে পিছনে বসিয়েছেন; বের করে দিয়েছেন। এগুলো আমাদের গলদ ভাবনা। যদি সে আল্লাহর কাছে মকবুল হতো তাহলে কার ক্ষমতা আছে তাকে দায়িত্ব থেকে বের করে দিবে? যাই হোক সুহাইল বলল হারিছকে যে, এতে আমীরের কোনো দোষ নেই। আমীরের দ্বারা আল্লাহ হতায়ালা এই কাজ এই জন্য করিয়েছেন যে, আমরা তাকাজা পুরো না করে, মেহনত না করে আগে বেড়েছিলাম। সে জন্য আমাদের পিছনে নিয়ে এসেছেন। আমি সত্যি কথা বলছি, প্রত্যেক পিছিয়ে যাওয়া সাথিদেরকে। যে, আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ক চিন্তা করে নাও, নিজের এবং আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্কটা ভালোভাবে খেয়াল করা উচিত। কেননা, নিয়ম হচ্ছে- যার সাথে কেউ সম্পর্ক কায়েম করে সে তাকে আগে বাড়াতে চায়। যদি সে আগে না বাড়ায় তবে মনে করে, সে আমার সাথে জুলুম করছে। এটি মনুষ্য ফিতরত বা স্বভাব। যে নিজের যোগ্যতা কোথাও লাগায় সে সেখান থেকে নিজের জন্য খায়ের প্রত্যাশী হয়। যে, আমি এখান থেকে খায়ের পাব। এখানে এসে সাথি পড়ে যায়, ধোঁকা খায়। সুহাইল হারিছকে এটিই বলছিলেন যে, আমীরের কোনো দোষ নেই। দোষ আমাদের নিজেদের। কারণ, আনসার-মুহাজিররা ময়দানে ছিল। তাই তারা আগে বেড়ে গিয়েছে। আমরা ময়দানে ছিলাম না। তাই পিছনে পড়ে গেছি। তাই আমি আরজ করছি কেউ কোনো মোকামে পৌঁছে এই কথা চিন্তা না করি যে, আমি এখান থেকে আর পিছনে যাব না। কাজেই নিজেকে আল্লাহর কাছে কবুল করাও। মনে রাখবে কবুল হওয়ার জন্য কাবিলিয়াত শর্ত না বরং কবুলিয়াতের স¤পর্ক সিফতে কবুলিয়াতের সাথে। আর সিফতে কবুলিয়াতের মধ্যে সবচেয়ে বড় জিনিস হলো তাওয়াযু বা বিনয়। তাওয়াযু দ্বারা কি উদ্দেশ্য? ঝুঁকে চলা? না, মোটেও না। এক ব্যক্তি ঝুঁকে চলার কারণে হযরত উমর (রা:) তার সিনায় ঘুষি মেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঝুঁকে চলার নাম তাওয়াযু না। তাওয়াজু হলো, নিজের জন্য কোনো ধরণের মুতালাবার (চাওয়ার) খেয়ালও না আনা। একে তাওয়াযু বলে। কিবর বা অহঙ্কারের বিপরীত হচ্ছে তাওয়াযু। কিবর হলো, এটা মনে করা যে, আমি এই কাজের যোগ্য। আমার দ্বারা ঐ কাজ করানো হোক। এগুলো হলো কিবরের আলামত। এক সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না? আমার থেকে কাজ নিবেন না আপনি? স্বয়ং সাহাবি এই কথা বলছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে কাজ চেয়ে নেয় সে আল্লাহর কাছে মকবুল না। কাজেই তাওয়াযু হলো, কাজ করনেওয়ালার দিলে নিজের ব্যাপারে কোনো মুতালাবা না থাকা। যদি মুতালাবা থাকে তাহলে সে মুখলিস না এটা পাকা কথা। আল্লাহর কসম এগুলো সত্যি কথা। আমি এইটা করব, আমার দ্বারা এইটা করানো হোক। লজ্জা থাকা দরকার যে, বান্দা এই কাজে আগে বাড়ার জন্য ঐ রাস্তা গ্রহণ করে যার ফলে সে আল্লাহর কাছে থেকে মরদুধ বা বিতাড়িত হয়ে যায়। মুখলিসিন ছিলেন হযরত উমর (রা:)। যার সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমার পর যদি কোনো নবী হতো তাহলে উমরই হতো। সেই উমর (রা:) বলতেন, হায়! যদি আমার বাবা-মা আমাকে জন্মই না দিতেন। হায়! যদি আমি কোনো ছাগল হতাম। যদি আমি কোনো গাছের সজিব পাতা হতাম। উট আমাকে খেয়ে পেট ভরে নিত। এরপর পায়খানা করে ফেলে দিত মাঠে-প্রান্তরে। বালি-কণার সাথে মিশে যেতাম বাতাসে। এই হচ্ছে মুখলিসিনদের তামান্না। এইটা না যে আমি এত বছর ধরে আছি; আমার সাথে কি হলো? আমি এত বছর ভরে আছি; আমার থেকে কি কাজ নেয়া হলো? আমি এত বছর ধরে আছি আমার কি উন্নতি হলো? আমি কি দায়িত্ব পেলাম? এসবতো দুনিয়ার চাকরিজীবীদের মধ্যে থাকে। দশ বছর ধরে, বিশ বছর ধরে কাজ করছি; আমার কি প্রমোশন হলো? আমাদের এইখানে তো এর কোনো সুযোগ নেই। অতত্রব, তাওয়াযু বা বিনয়ী তাকেই বলে যার মাখলুক থেকে পাওয়ার আশা নেই। কারণ তাওয়াযুর অর্থই হচ্ছে নিজেকে যোগ্য মনে না করা। যদি তাওয়াযু না থকে তবে নিজেকে যোগ্য ভেবে কাজ চাইবে, কাজের জন্য লড়াই করবে। যে, আমাকে বয়ান করতে দেয়নি। আমার দ্বারা হিদায়াতের কথা বলানো হলো না। আমাকে দিয়ে এই কাজ করানো হলো না। আমাকে দিয়ে ঐ কাজটি করানো হয় নি। আমাকে ঐ কাজ করতে দিলে এমন হতো না। এমন ধারণা মনে আসবে। শুধু কি তা-ই? নিজের সহযোগীদের উপর তরফদারী (পক্ষপাতিত্ব) করবে। যে তাকে সহায়তা করবে তাকে তার সঙ্গে রাখবে। এতে করেই কাজ করনেওয়াদের মধ্যে দলাদলির সৃষ্টি হয়। সহযোগীকে বলবে যে, তুমি আমার সাথে এসো। তুমি আমাকে সাহায্য করো। তুমি আমার পক্ষে মত দাও। তুমি আমার হয়ে কথা বলো। আমরা সবাই মিলে এই কাজ করব; ইত্যাদি, ইত্যাদি। অথচ সুন্নত হলো, নিজের হেমায়েতকারী বা সাহায্যকারীর প্রতি মনোযোগী হইও না। হযরত জায়েদ ইবনে সানআ হুজুর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে স্বেচ্ছায় করজ দিল। এরপর করজ আদায়ের নির্ধারিত সময়ের তিন দিন আগেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্বেচ্ছায় করজ দিল। এরপর করজ আদায়ের নির্ধারিত সময়ের তিন দিন আগেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে করজ আদায়ের জন্য দুর্ব্যবহার শুরু করল। এমনকি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘাড়ে ধাক্কা মেরে বলল, তোমরা কুরাইশরা এমনই খারাপ। যে কখনও কথা ঠিক থাকে না। যথা সময়ে মানুষের ঋণ আদায় করো না। তার উদ্দেশ্য ছিল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহনশীলতা পরীক্ষা করা। যে উনি নবী কি-না?
সাথিদের দিয়ে আল্লাহ তায়ালা কাজ করনেওয়ালাদের কাছ থেকে পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। যে, দেখো; কাজ করনেওয়ালা কি-না? কেননা বরদাস্ত করা নবুয়তের আলামত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা এবং নবুয়তের অন্য সব নিশানা সে পেয়ে গিয়ে ছিল। যে, তিনি নবী। হযরত উমর (রা:) এই অবস্থা দেখে ধৈর্যধারণ করতে পারছিলেন না। তিনি বললেন, যদি আল্লাহর রাসুল অসন্তষ্ট না হতেন এখনি তোমার মাথা কেটে জমিনে ফেলে রাখতাম। একথা বলেই তিনি তলোয়ার কোষ মুক্ত করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষনাৎ বলে উঠলেন, উমর! এ কি করছ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন নি; যে, উমর! আমার মহব্বতে করছে। তার করাটা ঠিক আছে। বরং তিনি ধমক দিলেন। আর আমাদের মধ্যে আমাকে যারা সাহায্য করবে তারা আমার সাথে আর যারা অন্যদের সহায়তা করবে তারা অন্যদের সাথে। এতে করে গ্র“প সৃষ্টি হয়। কাজেই নিজের সহায়তাকারীদের দমিয়ে রাখো- এটিই সুন্নত। যে নিজের সহায়তাকারীদের নিয়ন্ত্রণ করে রাখবে সেই হকের উপর। আল্লাহর মদদ তার সাথে। যে কারও সহায়তাকে নিজের উপর ইহসান মনে করবে সে ফাসাদ সৃষ্টি করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর (রা:) কে বললেন তোমার উচিত ছিল আমাকে এই কথা বলা যে, আমি যেন তার হক যথারীতি আদায় করে দিই। তাকে বলা উচিত ছিল যে, সে যেন আমার সাথে সদাচারণ করে তার প্রাপ্য আদায় করে নেয়। হযরত উমর (রা:) কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও। তার পাওনা আদায় করে দাও। সাথে আরো বিশ ছা’ খেজুর বেশি দিয়ে দিও। আল্লাহ মাফ করুন। আমি আমার সাথিদের মধ্যে এমন কাউকে দেখতে পাই নি; যে তার কষ্টদানকারীর উপর ইহসান করেছে। মূলত ইহসান তাই- যে কষ্ট দেয় তার উপর ইহসান করা। আমাদের হালত হলো, যে আমাদের উপর ইহসান করে আমরা তার উপর ইহসান করি। এত করে উম্মত কখনো তৈরি হবে না। নবুওতের মাকাম অনেক উঁচু, ওখানে তো হুকুম এই: যে তোমাকে কষ্ট দেয় তার উপর ইহসান করো। কেননা নবী হেদায়েত চায়, যে তাকে কষ্ট দেয় তার বদলায় ইহসান করে। আর আমাদের এখানে সাথী মিম্বরে বসে বলে যে, এটি নবুওয়াতওয়ালা রাস্তা। কিন্তু বাস্তবে নবীওয়ালা কষ্ট বরদাস্ত করতে তৈরি না। আমরা শেকায়াত করি-আমাদের উপর জুলুম করা হচ্ছে, আমাদের কষ্ট দেয়া হচ্ছে, আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। আর বলি নবীওয়ালা রাস্তা। তাহলে নবুওয়াতওয়ালা কাজ কিভাবে করা হলো? রাসুলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জখমি করা হলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই কওম কিভাবে কামিয়াব হবে যারা নবীর শরীর থেকে রক্ত ঝরায়? আল্লাহ তায়ালা বললেন, নবীজী! আপনার শেকায়েত করার কোনো হক্ব নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদের শেকায়েত করেছিলেন? কাফেরদের। তারপরও আল্লাহ তায়ালা বললেন, নবীজি! কাফেরদের ব্যাপারেও শেকায়াত করার হক আপনার নেই। কার কাছে শেকায়েত? আল্লাহর কাছে। এখন বলুন কোনো মুসলমানের তার সাথির শেকায়েত অন্য সাথির কাছে করার কী হক আছে? যেখানে কোনো কাফেরের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে নবীর শেকায়েত করার কোনো অধিকার নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ওহি নাযিল হলো :
ليس لك من امر من شيئ
নবীজি ! এর কোনো হক নেই আপনার ।
ويتوب عليهم او يعذبهم فانهم ظالمون
আমি জানি সে জালিম। আমি তাদের হিদায়াত দিয়ে মাফ করি অথবা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে আজাব দিই: এটি আমার ব্যাপার। আপনি আপনার কাজ করে যেতে থাকেন। আর আমাদের এই খানে কি বলব? এইখানে তো শুধু প্রতিশোধ নেয়া! সে আমার রায় কেটেছে। আমি তার রায় কেটে দিব। সে আমার কথা কেটেছে। আমি তার কথা কেটে দিব। আরো কত কিছু। চিন্তা করুন? কাজ করনেওয়ালারা ততক্ষণ জমতেই পারবে না, যতক্ষণ যারা তাদের কষ্ট দেয় তাদের উপর ইহসান করা না হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকেই জুড়ে নিতেন। উমায়ের ইবনে ওয়াহাব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাকে হত্যার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে এসেছিল। হুজুর পাক (স:) এর জানা ছিল যে, সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করার জন্য তলোয়ার ঝুলিয়ে এসেছে। এমনটি না যে, তিনি জানতেন না। উমায়ের বিন ওয়াহাব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আসার সময় তার বিবি-বাচ্চাকে সুফিয়ান ইবনে উমাইয়ার জিম্মায় রেখে এসেছিলেন। হযরত ওমর (রা:) বুঝতে পারলেন যে, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব হুজুরকে হত্যা করার জন্য এসেছে। উমায়ের তলোয়ারকে ভালোভাবে শান দিয়ে, তলোয়ারে বিষ মিশিয়ে নিয়ে এসেছিল। হযরত ওমর (রা:) তাকে দেখেই তার গর্দানে ঝাপটা মেরে ধরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে আসতে চাইলেন। সাথে সাথেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওমর! তাকে ছেড়ে দাও। তাকে আসতে দাও। হযরত ওমর (রা:) অস্থির হয়ে পড়লেন। এই ভেবে যে, যদি সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আক্রমন করে বসে। উমায়ের যখন ঘরে পা রাখলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা রাস্তা ছেড়ে দাও। উমায়েরকে বললেন, উমায়ের! আমার কাছে চলে এসো। চিন্তা করুন! উমায়ের কেন এসেছে? হত্যা করার জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনও বলতে পারতেন যে, তার গলা থেকে তলোয়ার খুলে রাখ। তাকে দাওয়াত দাও। তাকে বুঝাও। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কিছুই করলেন না। বরং তাকে সরাসরি নিজের কাছে ডেকে নিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কেন এসেছ? সে বলল, আমি আমার ভাইকে নিয়ে যেতে এসেছি। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, উমায়ের সত্য কথা বলো; কেন এসেছ? উমায়ের বলল, বললাম তো আমার ভাইকে নিতে এসেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তলোয়ার কেন নিয়ে এসেছ? উমায়ের বলল, তলোয়ার নিয়ে আসাতে কি অসুবিধা? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। তুমি ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া মক্কার হারামের মধ্যে কি সিদ্ধান্ত করেছ? তুমি আমাকে হত্যা করার জন্য এসেছ। উমায়ের সাথে সাথে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল। আমি এই জন্য এ ঘটনা শোনাচ্ছি যে, দেখুন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হত্যাকারীর সমন্ধে বলছেন, তাকে ছেড়ে দাও। তাকে আমার কাছে আসতে দাও। অথচ আমাদের মধ্যে সাথীদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে, তাকে আসতে দিও না। তাকে বের করে দাও। তার আমাদের কাজের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। সে তরতিব অনুযায়ী চলেনা। তাকে বয়কট কর। তাকে পড়চা দিও না। তাকে হটাও। দেখো, সে যেন আমাদের মাশোয়ারায় না আসে। ইত্যাদি, ইত্যাদি। জী হ্যাঁ-এই আমাদের হাল!
মেরে আজিজো, দোস্তোরা! আজ আমাদের মধ্যে যত জিদ (বিরোধ) সৃষ্টি হচ্ছে, তা শুধু আমাদের মেজাজের কারণেই হচ্ছে। আমাদের অন্তরে আমাদের সাথিদের জন্য সেই সহানুভূতি (গুনজায়েশ) নেই যে সহানুভূতি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের অন্তরে কাফিরদের জন্য ছিল। আমি এক প্রকৃত সত্য বলছি। আপনাদের বুঝে আসুক আর না আসুক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের যে উদারতা কাফিরদের জন্য ছিল, সে উদারতা আজ আমাদের সাথিদের জন্য আমাদের নেই।
জেনে রাখুন, সংকীর্ণ মন (তাংদিলী) নিয়ে দল গঠন হতে পারে কিন্তু উম্মত গঠন হতে পারে না। তবলিগ, বয়ান, তাকরির এগুলো দিয়ে কি লাভ হবে যদি মন ছোট থাকে? এই মেহনত কোন তানযিম বা সংগঠন নয়। যে, এর কোন মিম্বর হবে। এর জন্য সুনির্ধারিত নীতিমালা থাকবে। যে এই নীতিমালার খেলাফ করবে সে এই জামাতের অন্তর্ভূক্ত থাকতে পারবে না। এমন কখনও নয়। এই মেহনত একেবারে উন্মুক্ত এবং খোলা কাজ। এতে লোক সঠিকভাবে কাজ করবে, ভুলও করবে। এখানে কেউ কারো বিরোধী নয় যে, তাকে বহিষ্কার করে দাও। তাকে বের করে দিলে কাজ ঠিক ভাবে চলবে। বিলকুল না। এসব উলটো ধারণা। ভালোভাবে কাজ করনেওয়ালাও এই কাজ করতে পারবে। যারা ভালোভাবে কাজ করে না, তারাও এই কাজ করতে পারবে। কাউকে বের করে দেওয়ার যে ক্ষতি তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। ফায়সাল হওয়া কোনো হাকিম হওয়া নয়। যে, কোনো হুকুমত আছে। এমন না যে, আমাদের দেশে থেকে আমার হুকুমের বিরোধিতা করছে। মনে রাখতে হবে, এই কাজ সবার জন্য উন্মুক্ত। আমি পাবন্দি লাগাবে না কারও উপর যে, তাকে পাবন্দি লাগাও। বড় খোলা কাম আমাদের। এই কাজের জন্য কোনো শর্ত নেই যে, এই এই বৈশিষ্ট্যের লোকই এই কাজ করবে। যাদের মধ্যে এই ধরণের বৈশিষ্ট্য থাকবে না তারা এই কাজ করতে পারবে না। যদি এটি সাংগঠনিক কাজ হতো তবে এমন শর্ত থাকত। শর্তের খেলাফকারীদের বহিষ্কার করা হতো। অন্যদিকে যারা আমাদের সহায়তা করে, সমর্থন করে, তাদেরকে কাছে টেনে আনা, তাদের প্রতি অনুরাগী হওয়া রাজনীতি ওয়ালাদের কাজ। খোলাফায়ে রাশেদিনদের তরীকা হলোঃ যে আমার সাহায্যকারী হবে আমি তাকে পিছনে রাখব। যে এটি করো না; এটি করো না। হযরত উসমান (রা:) বলেছিলেন, আমার কারণে কারো রক্ত ঝরুক তা আমি কখনও চাই না। বরং আমি খেলাফত ছেড়ে দিতে রাজি আছি। তবুও কারো রক্ত ঝরুক তা আমি দেখতে চাই না। আমি একটি কথা আরজ করেছি যে, নিজেকে নিজে আল্লাহর কাছে কবুল করাও। আর কবুলিয়াতের সম্পর্ক সিফতের সাথে। প্রথম সিফত হলো তাওয়াযু। তাওয়াযুর অর্থ হলো যে, আমার কোনো মুতালাবা নেই। এই জন্য নবীকে যে প্রথম হুকুম দেওয়া হয়েছে তা নরমীর হুকুম; বিনয়ী হওয়ার আদেশ করা হয়েছে।
وخفض جناحك للمؤمنين
“আপনার বাহু ঝুঁকিয়ে দেন মোমিনিনদের জন্য, ঈমাণদারদের জন্য”। আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দুই স্থানে বেশি খেয়াল করতেন। এক রাতে তাহাজ্জুদের সময়। দুই দিনের বেলায় সাহাবাদের কাছে গাস্ত করার সময়। কুরআনে এই দুই সময়ের কথা বলা হয়েছে; যখন আল্লাহ পাক রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বিশেষ খেয়াল করতেন। এমন না যে, আমি বড়। তোমরা আমার কাছে আস। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের কাছে নিজে যেতেন। আমরা বলি, আমি যাব না। তারা আসবে। এই ধারনাই আজ নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সাহাবাদের কাছে যেতেন। তাদের ঘরে, তাদের মহল্লায় নিজে যেতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ইু ধরনের মুলাকাত করতেন। এক মুলাকাত ছিল কাফেরদের সাথে। আরেকটি ছিল সাহাবাদের সাথে। এই দুই মুলাকাতের উল্লেখ পাওয়া যায় কুরআনে।
ইরশাদ হয়েছে - الذى يراك حين تقوم وتقلبك الساجدين
এখানে الساجدين (সাজিদিন) দ্বারা সাহাবা কেরাম উদ্দেশ্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের অবস্থা পর্যবেক্ষনের জন্য নিজে তাশরিফ নিয়ে যেতেন। অতত্রব, নতুন-পুরোনো সব সাথীদের প্রতি আমার আবেদন- নিজেদের মধ্যে নরমি পয়দা করো। দুইটি কাজ আল্লাহর জন্য করে নাও। ১. বিনয়ী হও এবং ২. কষ্টদাতাদের প্রতি ইহসান করনেওয়ালার চেয়ে বেশি ইহসান করো। যে মানবে না তার জিম্মা নিজের উপর রেখ না তাকে আল্লাহর হাওলা করো। এইটাই সহজ রাস্তা। আল্লাহর কাছে দোয়া করো যে, হে আল্লাহ! সে গলদ করছে; তোমার কাজ অনেক দামি আর তার দিলও তোমার হাতে। একটি বাস্তবতা শোন-আমরা যতটুকু সাথিদের কাছে সাথির জন্য কান্নাকাটি করি ততটুকু সাথির জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি না। সাথির জন্য সাথিদের সামনে কাঁদি-উমুকে এই করেছে; উমুকে এই বলেছে; উমুককে সরাও; উনার দ্বারা কাজ খারাপ হচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু সাথির জন্য আল্লাহর কাছে কখনও কান্না আসে না। অথচ আল্লাহ তায়ালার কাছে ঐ দোয়া যা ফেরত দেয়া হয় না বরং মকবুলই হয় সেটি হলো ঈমানদারদের জন্য তার অগোচরে দোয়া। তাহলে সাথিদের জন্য দোয়া কেমন মকবুল হবে? অবশ্যই আরো বেশি মকবুল হবে। যে দোয়া আমরা নিজেদের জন্য করি তার খবরই নেই; কবুল হবে কি-না? কিন্তু হাদিসের মধ্যে আছে, যে দোয়া মুমিনদের জন্য করা হয় তা আল্লাহতায়ালারআল্লাহর কাছে কবুল হয়। যা মুমিনদের জন্য কবুল হবে, তা সাথিদের জন্য কত বেশি কবুল হবে? আমাদের জন্য শেকায়েতের পরিবর্তে দোয়া দেওয়া হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠিনভাবে সাহাবাদের নিষেধ করেছেন যে, আমার কোনো সাথির শেকায়াত নিয়ে আমার কাছে কেউ আসবে না। তিনি বলেন -
لا يبلغنى أحد عن أعد شيئا فإنى أحب أن أخرج إليكم وأنا سليم الصدرلكم
“আমি চাই-আমি যখন তোমাদের সামনে আসি তখন সবার ব্যাপারে আমার দীল সাফ থাকে”। আমাদের সবচেয়ে বড় খারাপ কাজ হচ্ছে, জিম্মাদারদের অন্তরকে সাথিদের শেকায়াত দ্বারা খারাপ করে দেওয়া। আমরা এটিকে একটি মুস্তাকিল কাজ বানিয়ে নিয়েছি। আমি আপনাদের তোহমতের জন্য বলছি না। বরং আমি আমার দেখা (মোশাহাদা থেকে বলছি। জিম্মাদারদের দিল সাথিদের খারাবি দ্বারা বিষিয়ে তোলা আজ আমাদের কাজ হয়ে গেছে। কমজোড়ি তালাশ করো। খবর করো। কমজোড়ি তালাশ করো। খবর করো। এটিই এখন মোস্তাকিল কাজ হয়ে গেছে। হাদিসের মধ্যে স্পষ্টভাবে আছে যারা দোষক্রটি খুঁজে বেড়ায তারা ঐ দোষক্রটিতে না জড়ানো পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না। এই কারণে শেকায়েত করনেওয়ালাকে অপেক্ষায় থাকতে হবে। যে, নিজে কখন ঐ দোষে লিপ্ত হবে যে দোষ তালাশ করে অন্যকে বলা হয়েছে।
আর বে-উসুলি করনেওয়ালারা? বে-উসুলি করনেওয়ালাদের ব্যাপারে কি করা? বে-উসুলি করনেওয়ালাদের উসুল বলে দাও। বৎস আল্লাহর কসম; এরচেয়ে বেশি জিম্মাদারী আমাদের কারও নেই; না আমার, না আপনাদের। এটাই বলা হয়েছে কোরআনে। যে গলদ করে তাকে সহীহ কথা বলে দাও- এটাই জিম্মাদারী। কেননা, আল্লাহর কাছে বড় হওয়া আসল। বড় কে হবে? যে, সে সহি কথা তাকে বলে দিবে। এমন না যে, আমি আপনাকে এটি করতে দিব না। আমাদের এখানে এই ধরণের কথা বা কাজের কোনো সুযোগই নেই। আমাদের এখানে জানি না কোথা থেকে আমাদের এখানে এগুলো শুরু হলো। আমাদের এখানে তরীকা এটি যে, তাকে সহী কথা জানিয়ে দাও যে, ভাই! সহী এটি। ব্যস। বরং বে-উসুলি করনেওয়ালার একরাম করো। কেননা, আপনাকে উনাকে উসুল বলার জন্য রাস্তা বানাতে হবে। হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. বলেন, প্রয়োজনে তার খেদমত করো অর্থাৎ তার জরুরত পুরো করো। রাস্তা বানাও তার কাছে পৌঁছার জন্য। যাতে সে তোমার কথাকে মেনে নেয়। আর তার বে-উসুলিকে কারো কাছে প্রকাশ করো না। যে, ভাই! শোন-উমুক ব্যক্তি এই এমন করতেছে। বে উসুলির আলোচনার দ্বারা বাতিল প্রসার লাভ করে। যদি বে-উসুলির আলোচনা না করা হয় তবে তার বে-উসুলি তার যাত (ব্যক্তি) পর্যন্ত থাকবে। যদি তুমি বে-উসুলির এলান করে দাও তবে স্মরণ রেখ, সব বে-উসুলি করনেওয়ালারা তার সাথে হয়ে যাবে। ফলে বে-উসুলী করনেওয়ালাদের আলাদা জামাত হয়ে যাবে। তখন এটি সারানোর কোনো ঔষুধ পাবে না। বরং এতে আপনি কাজের মধ্যে দুইটি রোখ সৃষ্টি করে দিলেন। যে, কাজের একটি রাস্তা এটি; কাজের আরেকটি রাস্তা এটি। তখন আপনি এতে শক্তি লাগাবেন যে, এটি আমাদের ফায়সালার শক্তি। আমাদের শুরার ফায়সালা। তখন কি হবে? এক হবে মার্কাজি হুকুমত। আরেক হবে অন্যদের হুকুমত। এগুলো হলো দুনিয়ার নেজাম। তখন টকরাও চলবে; শুরার সাথে টকরাও, মার্কাজের সাথে টকরাও এলাকার মার্কাজের মধ্যে টকরাও। সে আমাদের সাথে না। আর সে আমাদের তরতীবের উপর নেই। তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সে নিজের কাজ করছে। এগুলো কি? আমি কসম খেয়ে বলছি যত গলদ তরিকা চলছে সব আমার কারণে। এমন না সে করেছে। এগুলো সব আমি করেছি। আমি সাথিদের সাথে সংকীর্ণতা দেখাতে দেখাতে তার মধ্যে জিদ পয়দা করে দিয়েছি। তাই কারো বে-উসুলির প্রকাশ করো না। আমাদের এখানে আলোচনা শুধুমাত্র উসুলের। যা করা দরকার; তা বলো। যেটি করতে হবে না, তার আলোচনা করার কোনো দরকার নেই।
হযরত মাওলানা বলেন-বাতিলকে ধ্বংস করতে চাইলে তার জিকির ছেড়ে দাও। বাতিল মরে যাবে। প্রত্যেক জিনিস আলোচনা দ্বারা জিন্দা হয়। দ্বিতীয় কথা, এর আগেও আমি বলেছি, নিজের সাথিদের গলদের (ভুলক্রটির) ভালো ব্যাখ্যা (তাবিল) করো। এটি সুন্নত। আল্লাহ তায়ালার কাছে সত্য অপেক্ষা ঐ মিথ্যা পছন্দ, যে মিথ্যার দ্বারা মুসলমানের গুনাহ প্রমানিত হয় না। আমরা বলি, আমরা সত্য কথা বলছি। কিন্তু না। তোমার এই সত্য আল্লাহ তাআল্লার কাছে অপছন্দীয় আর তোমার এই মিথ্যা বলা আল্লাহ কাছে পছন্দীয়। এক সাহাবি মু’আজ বিন মালিক আসলামি (রা:)। তিনি তিনবার, চারবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন, হে আল্লাহর রাসুল ! আমি জিনা করে ফেলেছি। এটি কেউ এসে শেকায়াত করে নি। তিনি নিজে বলছেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি জিনা করে ফেলেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। যাতে কথা শোনা না যায়। আবার সে সাহাবি সামনে এসে বললেন। এবারও তিনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। শোনতেই চাচ্ছেন না তিনি। অথচ একজন পাক হওয়ার জন্য এসেছেন। আর আমাদের অবস্থা হচ্ছে, কোনো সংবাদ পেলেই সাথিকে পাকরাও করা শুরু করে দেই। খবর সত্য হতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে। ফাসেক নিয়ে আসতে পারে বা অন্য কোনো খারাপ লোক নিয়ে আসতে পারে। আর কোনো সংবাদ তাহকীক করার উদ্দেশ্য, ঈমানদারের গুনাহকে প্রমানিত করা না বরং সংবাদদাতা যে, ফাসিক তা প্রমাণ করা।
ان جاء كم فاسق بنبأ فتبينوا
খবরদাতা ফাসিককে পাকড়াও করার জন্য খবরের যাচাই-বাছাই করা যে, এই ফাসিকের খবর মিথ্যা। সে মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করার জন্য এই মিথ্যা খবর রটিয়েছে। তাহ্কীকের হুকুম এই জন্য যে, সংবাদটি ফাসিক ব্যক্তি দিয়েছে। যািদ কোনো মুমিন সংবাদ দেয় তাহলে তাহ্কীকের কোনো অনুমতি নেই। তাহ্কীকের হুকুম তো শুধু ফাসিকের আনা খবরের ব্যাপারে।
إن المنافقين هم الفاسقون
কেননা, ফাসিকরাই মুনাফিক হয়ে থাকে। আর তারা মুসলমানদের ক্ষতির চেষ্টা করে--- কোরআনে এমনই বলা হয়েছে।
ফাসিক ও মুনাফিক একই ব্যক্তির দুই নাম। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, যখন আমাদের কাছে কোনো সাথির ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হয়, তখন বলে থাকি তাহকীক করো। না, তাহকীকের অনুমতিই নেই। কেননা তাহকীক তখনই করতে হবে যখন কোনো ফাসিক খবর দিবে। ফাসিক আর মুনাফিক একই। কিন্তু কাউকে মুনাফিকা বলে ডাকা যাবেনা। ফাসিক আর মুনাফিক বলে ডাকা হারাম। ব্যস কিস্সা খতম। কাহিনী এখানেই শেষ করে দাও। এই জামানায় কোনো ওলির, কোনো শায়খের, কোনো বুজুর্গের কাউকে মুনাফিক বলে ডাকার অধিকার নেই। হযরত উমর (রা:) হযরত হুযাইফা (রা:) এর পিছনে পিছনে ঘুরতেন আর বলতেন-হে হুযাইফা! আমাকে এতটুকু বলে দাও যে, মুনাফিকদের নামের তালিকায় আমার নাম আছে কি-না? আমি এই কথা জানতে চাই না যে, কে কে মুনাফিক? শুধু আমি মুনাফিক কি-না? সেটি বলে দাও। হযরত হুযাইফা (রা:) বলেন, না। আর আমরা একজন আরেকজনকে মুনাফিক বলছি। সাথি সাথিকে প্রকাশ্যে মুনাফিক বলছি। আমি আপনাদের চিঠি পড়ে শুনাব। যে চিঠি আমার কাছে এসেছে। এভাবে বলা হয়েছে যে, উমুক তো মুনাফিক। জানি না কি কারনে এই প্রয়োজন হলো? আল্লাহর কাছে এর কি জবাব দিবে?
আমার আজিজ, দোস্তারা! আমি এটিই বলছিলাম যে, সাথি সাথিদের দোষক্রটির ভাল তাবিল করবে। সাথির দোষক্রটি গোপন করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিলে এই মিথ্যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয়। স্বচক্ষে দেখেছে যে, জিনা করেছে। যদি এমন ব্যক্তি এই জিনার কথা বলে দেয় তবে সে জিনাকারী অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট আল্লাহর কাছে। কেননা জিনা মাফ হয়ে যাবে। কিন্তু জিনার খবর মাফ হবে না। আমি এই কথাগুলো হাদিসের আলোকে বলছি; নিজের পক্ষ থেকে না। যে জিনা করেছে তার তওবা আছে কিন্তু যে জিনার সংবাদ প্রচার করে তার তাওবা নেই। শিরকের তওবা আছে কিন্তু গিবতের তওবা নেই। হাদিসে বর্ণিত আছে, যদি কেউ শিরক থেকে তওবা করে নেয় তবে আল্লাহ তার পিছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন কিন্তু গিবতের তওবা নেই। এজন্য হাদিসে রয়েছে,
الغيبة اشد من الزنا
আমি আপনাদের কি বলব! আজ আমাদের মারকাজগুলো গিবতে এতো অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, আমি কসম করে বলতে পারি-কোনো প্রাণির গোশত এতবেশি পরিমাণ খাওয়া হয় না, যে পরিমাণ গিবতের কারণে সাথিদের গোশত খাওয়া হয়। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কোনো প্রাণির গোশতই এই পরিমাণ খাওয়া হয় না। এিিট কোনো কাল্পনিক কথা না যে, গিবত করা ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো। বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিবতকারীর পেট থেকে বমি করিয়ে তাজা গোশত বের করে দেখিয়েছেন। দাঁত খিলাল করিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে গোশত বের করে দেখিয়ে বলেছেন। মানুষ হাদিসকে বুঝে না। এটি উদাহরণ দেওয়ার জন্য না। এই গুলো হাকিকত। আল্লাহ পাকের নিজাম যে, এখন গিবত করলে গোস্ত দেখা যায় না। কিন্তু একিনি যে, গিবত করে গোস্ত খাওয়া হচ্ছে, এগুলো নমুনা উদাহরণ না; সত্যিকার উদাহরণ। মানুষ মনে করে নমুনা উদাহরণ। কারণ অনেক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, হুজুর পাক সাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম গোস্ত বমির সাথে এবং দাঁত খিলাল করে দেখিয়ে দিয়েছেন।
কাজেই কোনো সাথির কোনো অপরাধ হয়ে গেলে এই অপরাধের ভাল তাবিল করো। তাবিল হলো অপরাধকে খুবি (ভালো) বানানো। আমাদের চোখের দেখার বিপরীত, কানের শোনার সম্পূর্ণ বিপরীত তাবিল করতে হবে। নিজ চোখে দেখার পর, নিজ কানে শোনার পরও একথা বলব যে, না আমি সত্যি বলছি এমন হয় নি। এভাবে আমি আমার সাথির বালো তাবিল করব। হযরত আলী (রা:) এর কাছে চোর আনা হলো। কি চুরি হয়েছে? উট। চুরির উটসহ তাকে আনা হলো। হযরত আলী (রা:) বললেন, উটতো সব একই রকম হয়। তুমি নিজের উট মনে করে উট খুলতে গিয়েছ আর মানুষ তোমাকে চোর ভেবেছে। চোর বলল, নিজের মনে করে খুলিনি। অন্যের উট মনে করেই খুলেছি। রায় হয়ে গেল হাত কাটার। তিনি বললেন, জল্লাদকে ডাক। তেল গরম করো। ফলে জল্লাদ তৈরি হলো আর তেলও গরম হয়ে গেল। এই সময় তিনি বললেন, আমি একটু আসছি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন। এসে চোরকে বললেন, ভাই! তুমি কোথা থেকে এসেছিলে? কেন এসেছ? তুমি কি চুরি করেছ? চোর বলল, না। আমি কোনো চুরি করি নি। এর পর আলী (রা:) তাকে বললেন, যাও। তোমার ছুটি। আর আমরা সাথিদের ছাড়ি না। সাথিদের পাকড়াও করি। আর সাহাবিরা চুরি করে অস্বীকার করনেওয়ালাকে ছেড়ে দিয়েছেন। সাথিরা জিজ্ঞেস করলে আলী (রা:) বলেন, আমি তাকে আটক করেছিলাম তার স্বাীকারোক্তির কারণে, ছেড়ে দিয়েছি তার অস্বীকারের কারণে।
দেখো মেরে দোস্তো !
এই কাজ করার জন্য বহুত বড় মন হওয়া চাই। বহুত বড় মন। এমন নয় যে, রাজনীতির মেজাজে, ব্যবসায়িক মেজাজে, হুকুমতের মেজাজে আমি এই কাজ করব। না, এই জন্য নবুওতওয়ালা মেজাজ চাই। হায়াতুস সাহাবা বেশি বেশি পড়। শুধু পড়া না। নিজেকে এর তাবে করো। এই সব ঘটনাবলী নিজ জীবনে ফুটিয়ে তোল। নতুবা পড়ায় কোনো ফায়দা নেই। যে ইলমের আমল হয় না তা মুখোশি ইলম। এর কোনো ফায়দা নেই। সাহাবারা (রা:) বলেন, জাহেল ঐ ব্যক্তি যার আমলের সময় ইলম স্বরণে আসে না। ইলম ও আমলের মধ্যে যদি বরাবর না থাকে তবে তাকে আলিম বলে না। অন্যথায় কাফিরদেরও দ্বীনের বিষয়ে অনেক জানা-শোনা ছিল। তাই কোনো বিষয়ে জানা-শোনাকে ইলম বলে না। ইলম বলে মা’মুলকে। ইলম হলো, যা আমল করা হয়। আমল থাকলে আলেম। আমল নেই আলেম না। ইলম ও আমল দুইটি ভিন্ন জিনিস না। জেহালত ও আনুগত্য দুইটি ভিন্ন জিনিস। যদি কোনো সাথির ভুলক্রটি দৃষ্টিগোচর হয় তবে তার ভালো তাবিল করো। নিজেদের মেজাজ বদল করে নিই। আমরা মেজাজ বদল করে নিলে হালত খোদবাখোদ বদল হয়ে যাবে। এটি সম্পূর্ণ পাকা (সত্য) কথা। সাথে সাথে সাথিদের ভুলের উপর তার কুরবানি স্মরণ করো। এটি সুন্নত। আজ সারা দুনিয়াতে কাজ করনেওয়ালা সাথিরা এই সুন্নতকে ছেড়ে বসে আছে। সব জায়গায় একই অবস্থা। ভুল করনেওয়ালার কুরবানিকে দেখা হয় না। ভুল করনেওয়ালার ভূলকে দেখা হয়। এটি কাজ করনেওয়ালাদের আলমী ভুল। এই মেজাজ সুন্নতের খেলাফ। আপনারাই ভাবুন-আমরা কত সাধারণ ভুলের কারনে সাথিদের কাটি (ধক্ষংস করে দিই)। কাটার চেষ্টা ঐ ব্যক্তি করে যে, নিজের জন্য চলার রাস্তা পরিষ্কার করতে চায়। আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যক্তিকে এভাবে বঞ্চিত করেন যে, তালাশ করেও পাওয়া যায় না। যে , সে কোথায় গেল? এটি রাজনীতির মেজাজ। যে, তাকে সরিয়ে আমি আগে বাড়ব। এভাবে হিংসা সৃষ্টি হয়। হিংসা নেকিকে এভাবে খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে। সাহাবাদের মেজাজ এমন ছিল যে, যখন কারো মধ্যে কোনো ভালো গুন দেখতেন তখন তার সাথে থাকার চেষ্টা করতেন। যাতে ঐ গুন তার মধ্যেও এসে যায়। এমন করতেন না যে, যে তার গুনের দ্বারা আগে বেড়েছে তাকে প্রতিহত করো।
প্রত্যেক সাথির মধ্যে গুন (যোগ্যতা) রয়েছে, বিশেষ বিশেষত্ব রয়েছে। আমি আপনাদের বলব সাথিদের যোগ্যতা কি ভাবে নষ্ট হয়? এই চিন্তার দ্বারা যে, সাথি আমার অধীন থেকে কাজ করবে। আমি আরো স্পষ্ট করে বলছি, সাথিদের যোগ্যতা এই কারণে নষ্ট হয় যে, উপরস্থরা তার যেগ্যতাকে চাপা দিয়ে রাখে নিজের স্বার্থের কারণে। মনে করে, সে যদি এই পদ পেয়ে যায় তবে আমি কি করব? আমি থাকতে সে এই সম্মান পাবে আর আমি পাব না; এটি কি করে সম্ভব? মনে রেখ, এই ধরনের মেজাজ সাহাবাদের মেজাজের বিপরীত। সাহাবাদের মেজাজ এই ছিল যে, যদি কারো মধ্যে কোনো ভালাই দেখতেন, তবে উনার সাথে থাকতেন। যাতে আল্লাহ পাক তার মতো কাজ আমার থেকেও নিয়ে নেয়। এটি সাহাবাদের ইস্তেমায়িয়াতের বড় সবব ছিল। আমি কি আপনাদের বলব, আমাদের আপোষে কাটার কারণ কি? আমাদের আপোষে কাটার কারণ হলো, আমি থাকতে উনার থেকে কাজ কেন নেওয়া হলো? সে আমার পরে কাজে লেখেছে। আমি আগে থেকে আছি। এটিই হচ্ছে শয়তানের কুফরি। শয়তান আল্লাহকে অস্বীকার করার কুফর করেনি। শয়তানের কুফর ছিল নিজের অহংকার আমি পুরোনো আমি বড়। আমি থাকতে নতুন সৃষ্টি আদম সম্মান পাবে? এ কি করে হয়?-এই মনোভাব। অথচ আল্লাহর হুকুম ছিল, সবাই আদমকে সেজদা করো। সবাই সেজদা করল; ইবলিস ব্যতীত। আমাকে বলা হলো যে, তুমি এই জামাতে মামুর হয়ে যাও। তো আমার শরম লাগে। কারণ আমি তাকে নিয়ে এসেছি। এখন বলা হচ্ছে সে আমার আমীর হবে আর আমি তার মামুর হয়ে জামাতে যাব? এটি কেমন কথা? আল্লাহ আমাকে মাফ করেন। কোনো সাথি যদি এই কথা বলে যে আমার সাথে এটি কি করা হলো? তবে সেও শয়তানওয়ালী কথা বলল। শয়তানের সব ঘটনা এমনই যে, আমি তার থেকে ভালো। আমি তাকে সেজদা কেন করব? সাহাবাদের মেজাজ এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবাদের সামনে ঘোষনা দিলেন, এই ইয়েমেনি তলোয়ার কে নিতে চাও? ইয়েমিনি তলোয়ার ঐ সময়ে সবচেয়ে ভাল তলোয়ার ছিল। হযরত জুবাইর রাযি. দাঁড়ালেন। তিনি একজন পুরনো সাহাবী, আবার হুজুরসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ফুফাতো ভাই ছিলেন, আতœীয় ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনম তুমি না। ২য় বার এলান দিলেন, ইয়েমিনি তলোয়ার কে নিতে চাও? হযরত উমর (রা:) দাঁড়ালেন। যার যোগ্যতা সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছিলেন, আমার পর যদি নবী হতো তাহলে সেই নবী হতো ওমর (রা:)। সুতরাং উমর (রা:)-এর মতো যোগ্যতা কারও ছিল না। কিন্তুরাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তলোয়ার ওমর (রা:)-কেও দিলেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় বার এলান দিলেন। এবারের এলান খুব শক্ত এলান ছিল। দুই বার তিনি বলেছেন, এই তলোয়ার কে নিবে? এবার বললেন, কে আছ; যে এই তলোয়ারের হক আদায় করতে পারবে? দাঁড়িয়ে যাও। হযরত আবু দুজানা (রা:) দাঁড়ালেন। তিনি ছিলেন সবার থেকে ছোট, নতুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নতুন সাহাবিকে তলোয়ার দিলেন। ঐ মজলিসে অনেক বড় বড় বীর-বাহাদুর সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তলোয়ার উনাকে দিয়ে দিলেন। আল্লাহ মাফ করেন। আমাদের তো এই এশকাল (বিরোধীতা) আমি পুরাতন। আমি থাকতে এটি কেন হবে? আমি পুরাতন। আমি থাকতে কেন তাকে বয়ান দেয়া হলো? আমি পুরোনো। আমি থাকতে এই ফায়সালা কেন করা হলো? ইত্যাদি বহু সমস্যা। মনে রেখো, এই দ্বীনের কাজে যে ব্যক্তির নজর নিজের কুরবানির উপর পড়বে সে আল্লাহর কাছে মুখলিস হতে পারবে না। কেননা, মুখলিসিনদের নজর নিজের অক্ষমতার আর দোষের উপর থাকে এবং অন্যের কুরবানির উপর থাকে। হযরত আবু দুজানা (রা:) তলোয়ার নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। হযরত জুবায়ের (রা:) বলেন, আমি আবু দুজানা (রা:)- এর পিছনে পিছনে চলতে থাকলাম। আমার মন চাচ্ছিল সেই কারণ খুঁজে বের করতে যে কারণে আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার মধ্যে হযরত আবু দুজানাকে এই কাজের জন্য বাছাই করলেন। জুবায়ের (রা:) উনার কার্যকলাপ দেখে বললেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন যে, কার দ্বারা, কোন কাজ নেওয়া উচিত? আমি এই ঘটনার দ্বারা বুঝাতে চাচ্ছি যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন সাহাবাকে জিম্মাদারী দিয়েছেন। পুরোনো সাহাবারা তা অকপটে মেনে নিলেন। এমন কোনো ভাব প্রকাশ করেন নি যে, আমরা এই ফায়সালা মানি না। আমরা এর আনুগত্য করব না। হে আমার সাথিরা ! আমাদের মধ্যেও কোনো নতুন সাথিকে জিম্মাদারী দেয়া যেতে পারে। তখন আমরা কি তার আনুগত্য করব না? দেখো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর উসামা (রা:) এর মতো কম কয়স্ক সাহাবিকে সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া সমস্ত সাহাবিদের জন্য পরীক্ষা ছিল যে, কারা আনুগত্য করে আর কারা আনুগত্য করে না? মনে রেখো, বড়দের শ্রদ্ধা করা, বড়দের মানা সাধারণ ব্যাপার। এটি স্বভাব সুলভ। যে কেউ তা করতে পারে। কিন্তু বড়দের ছোটদের আনুগত্য করা এক বড় কঠিন ব্যাপার। সেখানেই বুঝা যায় কার আনুগত্যে ইখলাস রয়েছে আর কার আনুগত্যে ইখলাস নেই?
আমি আপনাদের কাছে এই কথাই রাখছি যে, যদি আল্লাহ তায়ালা কোনো সাথির থেকে কোনো কাজ নেন, তবে সাথিরা তার প্রতি হিংসা না করে। এমন কি তার কোনো ভুল হয়ে গেলে তার কুরবানিকে দেখে। আমি আপনাদের এমন এক অপরাধের কথা বলব, ইসলামে যা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু এমন ঘটনাও ঘটেছে সাহাবি থেকে। কিন্তু ঘটনার উপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করেছেন? এই ঘটনা শোনার পর আমরা চিন্তা করি যে, আমরা কত সাধারণ অপরাধের কারণে সাথিদের কাটি।এখানে সাহাবাদের অন্যায়কে তুলে ধরা উদ্দেশ্য না। বরং কোনো অন্যায় হয়ে গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন ব্যবহার করতেন? তা বুঝানোই এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য। এক সাহাবি ছিলেন, হাতিম ইবনে বালতাআ (রা:)। উনার অন্যায়টি ছিল তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মক্কা আক্রমনের পরিকল্পনা গোপনসূত্রে মক্কাবাসীর কাছে ফাঁস করে দিচ্ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিকল্পনা করলেন, মক্কায় আক্রমণ করবেন। হাতিম ইবনে আবি বালতাআ এক কাগজের টুকরায় গোটা প্লান লিখে তাতে এটিও লিখে দিলেন যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে মক্কায় এমন তীব্র আক্রমণ চালাবেন যে, মক্কাবাসীরা স্রোতের মতো ভেসে যাবে। তোমাদের টুকরো টুকরো করা হবে। মনোযোগ দিয়ে শোন। এটি সাধারণ অন্যায় না। পুরা সিরাতের মধ্যে এরচেয়ে বড় অপরাধ আমার নজরে আর আসেনি। চিন্তা করুন, মুসলমানের, গোপন রাজনৈতিক কৌশল মুশরেকিনদের কাছে প্রকাশ করে দেয়া; এরচেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে? যাই হোক এক মহিলা এই চিঠি নিয়ে মদিনা থেকে রওয়ানা হলো। এই খবর নিয়ে হযরত জিবরাইল (আ:) এলন। বললেন-উমুক মহিলা। উমুক জায়গায় আছে। হযরত হাতিমের চিঠি নিয়ে মক্কা মোকাররমা যাচ্ছে। ঐ চিঠিতে এই আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মেকদাদ এবং হযরত উসমান এই দুই জনকে দ্রুত পাঠিয়ে দিলেন। যে যাও। উমুক জায়গায় এক মহিলাকে পাবে। সে মক্কা যাচ্ছে। ঐ মহিলার কাছ থেকে চিঠিটি নিয়ে আসো। এই জায়গায় একটি কথা আরজ করছি আপনাদের কাছে। যে বে-উসুলি করনেওয়ালার দ্বারা কাজের কোনো ক্ষতি হবে না। কাজ করনেওয়ালার ক্ষতি হবে। এটি সম্পুর্ণ বাতিল খেয়াল যে উমুকের দ্বারা কাজের ক্ষতি হবে। আল্লাহ স্বয়ং কাজের হেফাজত করনেওয়ালা। তো উনারা তেজি ঘোড়ায় চড়ে ঐ জায়গায় পৌঁছে গেলেন। ঐ মহিলার কাছে চিঠি চাইলেন। ঐ মহিলা চিঠি থাকার কথা অস্বীকার করল। বললেন আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। সাহাবি বললেন, যদি তুমি চিঠি না দাও তবে তোমাকে তল্লাসি করব। উলঙ্গ করে তল্লাসি করব। পরে মহিলা মাথার চুল থেকে চিঠি বের করে দিলেন। উনারা চিঠি নিয়ে ফেরত এলেন। এরপর হাতিমকে ডাকা হলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেলেন, হাতিম ! তুমি এ কি করলে? হাতিম (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি শুধু আমার বাচ্চাদের হেফাজতের জন্য মুশরিকদের উপর এহসান করেছি। যাতে ঐ এহসানের বদলায় তারা আমার বাচ্চাদের হেফাজত করে। অপরাধ ছিল অনেক বড়।
হযরত ওমর (রা:) বললেন হে আল্লাহর রাসুল আমাকে অনুমতি দেন তাঁর গর্দান ওড়িয়ে দেই। হযরত ওমর (রা:) কতল করার এরাদা করে ফেলেছিলেন। আমি আগেই বলেছি, সাথীদের ভুল বা অপরাধের মুকাবেলায় তাঁর কুরবানির কথা স্বরণ কর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ওমর, তুমি হাতিমকে কতল করতে চাও? অথচ সে বদরী সাহাবি। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলে দিয়েছেন, হে আহলে বদর, তোমরা যা ইচ্ছা, তাই করো। আল্লাহ তোমাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। ভেবে দেখুন! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এত বড় অন্যায়কে তার কুরবানির দ্বারা ঢেকে দিয়েছেন। তিনি বদরী সাহাবী। আমার প্রিয় বন্ধুরা, আমরা চিন্তা করি, যে অপরাধে আমরা সাথিদের পাকড়াও করি সে অপরাধের সাথে এই অপরাধের কি কোনো তুলনা হতে পারে? এত বড় অপরাধ মুশরিকীনদেরকে মুসলমানদের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দেওয়া! তাই জ্ঞান বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমাদের সাথিদের থেকে কাজ নেওয়া দরকার। হাদিসে আছে যে كلكم خطاؤون “তোমরা কেউ ক্রটি মুক্ত না” তোমরা সবাই কোন না কোনো ভুল করে থাক। সুতরাং কে বলবে যে, আমার কোনো ভুল বা আপরাধ নেই? আমি এই কথা বলে, যে ব্যক্তি বলে আমার কোনো ভুল নেই সে এই হাদিসকে অস্বীকারকারী। কারন হাদিসে বলা হচ্ছে তোমরা সবাই ভুল করনেওয়ালা তাহলে কে বাকি রইল। কেউ বাকি নেই? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সর্বোত্তম ভুলকারি ঐব্যাক্তি যে তার ভুলের জন্য তওবা করে। তওবা অর্থ এস্তেগফার না। এস্তেগফার গুনাহ মাফের জন্য। তওবা হল, যে গুনাহ সে করেছে, সে গুনাহ না করা। সে তায়িব। তায়িব কে? যে গুনাহের প্রতি আর কোন দিন না যায়। আল্লাহ তায়ালা কবুল করনেওয়ালা? যে গুনাহের ভাল দিকে ২য় বার ফিরে না যায়। আমি বলেছিলাম সাথীদের ভুল বা অপরাধের উপর ভাল তাবিল করো। তবে তাদের বেউসুলির উপর কুরবানি ইয়াদ কর যদি কোন শেকায়েত আসে তবে খুবি তালাশ কর। এক জানাযা আনা হল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়ানোর জন্য এলেন। ঐ জানাযা এত খারাপ এত নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছিল যে সবসময় খারাপ কাজে মগ্ন থাকতো মদিনায় বাস করত লোকটি। জানাযা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে রাখা ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়ানোর জন্য সামনে এসে দাঁড়ালেন। হজরত ওমর (রা:) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানাযায় বাধা দিলেন। বললেন, হে আল্লাহ’র রসুল এই নামাজ আপনি পড়াবেন না। আমাদের মধ্যে থেকে কেউ তার জানাযার নামাজ পড়িয়ে দিক। এতে অনুমান করা যায় যে, লোকটি কত জঘন্য পর্যায়ের ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়াবেন তা ওমর (রা:) বরদাশত করতে পারছিলেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করে দিলেন তোমাদের মধ্যে কেউ কি এই লোকটি কে কোন ভাল আমল করতে দেখেছ? এলান করেছেন। এমন না যে শুরা ওয়ালাদের ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে অমুকের ব্যাপারে কি করা যায়? সাহাবাদের মধ্যে আম এলান করা হলো। এই এলানের উদ্দেশ্য ছিল হযরত ওমর (রা:) কে জবাব দেওয়া যে, ওমর তুমি কিভাবে মানা করলে তার জানাজা পড়াতে? পিছন থেকে এক সাহাবি দাড়িয়ে গেলেন। তিনি বললেন অমুক অমুক সময় এই সাহাবি এক রাত আল্লাহ’র রাস্তায় পাহারা দিয়েছে। মৃত ব্যক্তির খুবি তালাশ করা হচ্ছে এলান করে। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সম্বোধন করে বললেন, শোন যে চোখ আল্লাহ’র রাস্তায় এক রাত জেগেছে সে চোখ কখনও জাহান্নাম দেখবে না। আপনাদের এইখানে খেদমতে কত লোক আছে, খেদমতের পাহারায়। ২০০ এর চেয়েও বেশি। তাদের মধ্যে কতজন চিল্লা লাগানো আছে, কতজন ৪ মাস লাগান আছে, কতজন নতুন আছে, কতজন ছাত্র আছে, আরও কে কে আছে? কি করছে তারা? পাহারা দিচ্ছে। অনেকের কাছে তাদের কোন মূল্য নেই। তারা কাজ করে যাচ্ছে। যা হোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই লোকের ঐ আমল তালাশ করলেন যা জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দেয়। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওমর তুমি পিছনে সরে যাও। তোমার কোন অধিকার নেই কোন মানুষের আমল সম্পর্কে খারাপ বলা। এরপর আগে বেড়ে ঐ সাহাবির জানাযার নামাজ পড়ালেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির এমন কোন কাজ তালাশ করছিলেন যা জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দেয়।
কাজেই যখন কোনো সাথির মন্দ কাজ চোখে পড়ে তখন তার ভালো কাজগুলো তালাশ করো। নিজের মেজাজ পরিবর্তন করি। এটি ছাড়া না ইজতেমায়িয়াত হবে,না আল্লাহর মদদ পাওয়া যাবে। নিজেকে নিজে আল্লাহর কাছে কবুল করাও।
এই কারণেই আল্লাহ হতায়ালা এই আদেশ দিয়েছেন فاعف عنه “নবীজি! কেউ আপনাকে কষ্ট দিলে আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন। যদি তারা বে-উসুলি করে তবে তাদের জন্য ইস্তেবগফার করুন। কাজের ক্ষেত্রে আপনি তাদের সাথে মাশোয়ারা করুন।” দেখ মাশোয়ারা ভেঙ্গে গেলে সব সাথি বিগড়ে যাবে। মাশোয়ারা এমন একটি আমল যা সাথিদের একতার সুতোয় গেঁথে রাখে। তাই মাশোয়ারাকে নবুওয়াতের ত্বরীকায় করো। এখানকার মাশোয়ারায় চেষ্টা থাকে যে মাশোয়ারায় শুধুমাত্র ঐসব লোক বসে যারা আমার মতের সাথে একমত থাকতে পারে। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাশোয়ারা এত উমুমি ছিল যে মুনাফিক পর্যন্ত সেই মাশোয়ারায় শামিল হতো। মুনাফিকরা আল্লাহর দুশমন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুশমন, মুমিনদের দুশমন। তারা ইসলামের জন্য কাফেরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কাফের বাহির থেকে লড়াই করে। মুনাফিক সাথে থেকে ক্ষতি করে। কিন্তু তারপরও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশোয়ারা হতে মুনাফিকদের বের করে দিতেন না। যে, তাদের বের করি। তারপর মাশোয়ারা করি। বরং তাদের সাথে নিয়েই মাশোয়ারা করতেন। শুধু এতটুকুর জন্য যে, ওমর! যারা আমাদের বিরোধী, যারা মুনাফেকদের আমাদের লোক বলে মনে করে তারা ভাববে যে আমাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে; আমাদের পরস্পরে ফাটল দেখাখা দিয়েছে। অর্থাৎ মুনাফিকদের মেনে নেওয়া হয়েছে শুধু নিজেদের ইজতেমায়িয়াতকে জাহির (প্রকাশ) করার জন্য। আর আমরাতো ঈমানওয়ালাকেও মেনে নিতে চাই না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ইজতেমায়িয়াতকে প্রকাশ করার জন্য মুনাফিকদের শাস্তি প্রদানে ছাড় দিয়েছেন; দুশমনকে ছাড় দিয়েছেন। এদিকে আমরা আমাদের কাজের সাথিদেরকেও ছাড় দিতে চাই না। তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি আমাদের থেকে। এখন চিন্তা করুন, সাথিদের বের করে দিলে দুনিয়াতে আমাদের বিরোধিতা কত প্রসিদ্ধ হয়ে যাবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের সমন্বয়ে মাশোয়ারা করতেন। পরবর্তীতে যখন মুনাফিকরা চলে যেতেন তিনি সাহাবাদের সাথে তাওরিয়া করতেন। তাওরিয়া বা তরিয়া হচ্ছে, কথার রহস্য ভেঙ্গে দেওয়া। এভাবে যে, আমি বলেছিলাম ঐদিকে যাব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি, তিনি খুলে বলে দিতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে জানতেন কারা মুনাফিক, কারা মুমিন? ইচ্ছে করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের ছাড়াও পরামর্শ করে নিতে পারতেন। কিন্তু করতেন না। সবার মধ্যে ইজতেমায়িয়াত প্রকাশ করার জন্য।
আজ আমাকে লজ্জার সাথে বলতে হচ্ছে যে, আমরা আমাদের সাথিদের সাথে ঐ ব্যবহার করি, যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের সাথেও করতেন না। তাই আল্লাহর ওয়াস্তে এই কাজকে সুন্নত তরীকার উপর নাও। মাশোয়ারাকে ইজতেমায়ি বানাও। সাথিদের থেকে বিষয়বস্তুকে গোপন রেখো না। সাথির কাছ থেকে উমূরকে গোপন রেখো না। সাথির কাছ থেকে উমূরকে গোপন করা সাথির সাথে খেয়ানত, কাজের সাথে খেয়ানত। এই জন্য সাথিদের থেকে উমূরকে লুকানো চাই না। বরং সাথিদের কাছে থেকে রায় নাও। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য কারো সাথে মাশোয়ারা করার কোনোই প্রয়োজন ছিল না। কেননা, উনাকে সরাসরি ওহি দ্বারা সবকিছু জানান হতো। আর আল্লাহ তায়ালার মাশোয়ারার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি আলিমুল গায়েব। হাদিসে আছে
الله ورسوله غينان عن المشورة
আল্লাহ ও তার রাসুল মাশোয়ারার মুখাপেক্ষী নন। তারপরও আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নির্দেশ করেছেন-
شاورو هم فى الامر
হে নবীজি ! আপনি সাথিদের সাথে পরামর্শ করুন। কেন? হাদিসে আছে যে পরামর্শ করে কাজ করবে সে খায়েরের উপর থাকবে। যে পরামর্শ করবে না সে পেরেশানীতে থাকবে। সমস্ত পেরেশানী আসার কারণ মাশোয়ারা ছুটে যাওয়া। নিজেরদের মাশোয়ারাকে প্রশস্ত করো। রায় নাও এবং ফায়সালা করে দাও। যদি তোমার কথা সাথিরা না মানে তবে তুমি স্মরণ কর হুদায়বিয়ার কথা। হুদায়বিয়ায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের বারবার আদেশ করেছিলেন মাথা মুন্ডিয়ে নাও, মাথা মুন্ডিয়ে নাও। উনারা মানতে চাচ্ছিলেন না। হজরত উম্মে সালমা (রা:) বলেছিলেন হে আল্লাহ’র রাসূল আপনার বারবার বলার প্রয়োজন নেই। আপনি যেয়ে আপনার মাথা মুন্ডিয়ে নেন । আর আপনার বকরি জবেহ করে দিন। সাহাবারা আপনার আমল দেখে আমল করবে। আপনি আমল না করলে কেউ আমল করবে না। কাজেই সাথিদের উপর ফায়সালা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। বরং সাথিদের থেকে রায় নিয়ে ফায়সালা করা যায়। যদি তাদের কাছ থেকে রায় না নেয়া হয় তবে ফায়সালা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে। তারা বলবে আমাদের জিজ্ঞাসাও করা হয়নি এই ব্যাপারে। আমরা কি করব? আরেকটি কথা বলছি, নিজের বিষয় গুলো তানফিসের জন্য রাতে আল্লাহ’র কাছে দোয়া করে আল্লাহ’র সাহায্য নাও। এমন না যে ওর কাছে বলো এর কাছে বল, কাউকে কড়া কথা বল। কাউকে শাসন করো। চেহারা মলিন করো। এমন কখনও উচিত না। বরং উমূর এর বাস্তবায়ন রাতের ইবাদতের দ্বারা হবে। নিজেদের মাশোয়ারা গুলো প্রশস্ত কর। মাশোয়ারাকে ইজতেমায়ি বানাও। শুরা ওয়ালাদের মধ্যে ঐ পর্যন্ত ইজতেমায়িয়াত বাকি থাকবে, শুরা ওয়ালারা যতক্ষণ পর্যন্ত আনেওয়ালা উমূর নিজেদের সাথীদের সামনে রাখতে থাকবে। যদি শুরাওয়ালারা কিছু মাসায়েল কে সাথিদের কাছে গোপন করে এবং কাল সে সাথি জানে যে এই মাসায়েল এসেছিল কিন্তু আমাকে জানানো হয় নাই তবে বুঝে নিন মাশোয়ারা ওয়ালাদের মাঝে আর ইত্তেফাক (ঐক্য) থাকবে না। কারন এতে এতেমাদ (আস্থা) শেষ হয়ে যাবে। তাই নিজেদের মাশোয়ারাওয়ালাদের মাঝে সব সময় মাসায়েল কে রাখ যে, এই মাসায়েল সামনে এসেছে, কি করা যায়? এমনকি বিষয়টি নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপার হলেও। হযরত আবু বকর (রা:) খেলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত বেতন ভাতা নিতে চাচ্ছিলেন না। মাসায়েলটি মাশোয়ারায় আনা হল। মাশোয়ারায় যেমন সিদ্ধান্ত হয় মেনে নিব। এমন জজবা ছিল। মাশোয়ারায় সিদ্ধান্ত হল বেতন গ্রহনের জন্য, তিনি মেনে নিলেন।
আরেকটি জরুরি কথা হলো, মাশেয়ারাওয়ালাদের কারো কাছে যদি কোন মাসায়েল নিয়ে আসা হয়, যেমন, অমুক এলাকায় এমন হচ্ছে। আর কথা এমন। তবে খবরদাতাকে বলো, আপনি এই মাসয়ালা কে ইজতেমায়িভাবে আমাদের কাছে নিয়ে আসুন। কোরআনে এমনি বলা হয়েছে। ردوه الى الله “নিজেদের মাসয়ালাকে ইজতেমায়িভাবে নাও।” মাশেয়ারাওয়ালাদের দায়িত্ব হল, যদি কোন বিষয় ইজতেমায়িভাবে আসে তবে এর জবাব সাথে সাথে না দেওয়া। যদি আমরা আমাদের সাথিদের মধ্যে ইজতেমায়িয়াত চাই, তাদের জবাব দেন, এটি আমাদের মাশোয়ারায় রাখব। আমরা উমুক সময় একত্র হব। কারন ফায়সালা কোনো অথোরিটি (কর্তৃপক্ষ) না। কোন ক্ষমতা প্রাপ্ত বিচারক না, যে আমার এখতিয়ার আছে, আমি ফায়সালা করে দিব। নিজের সাথিদের সামনে রাখেন বিষয়টি। এরপর সবার রায় নিন। এরপর ফায়সালা করেন। যা ফায়সালা হয়েছে তার উপর খায়ের আল্লাহ’র কাছে চান। ফায়সালার পর কেউ এর তাজকেরা (আলোচনা) না করি। আমাদের কমজোরি হলো, যদি কোনো ফায়সালা কারো বুঝে না আসে তবে সে যেয়ে তার গ্র“পের সাথে বসে যায়। তখনত আমাকে আল্লাহ’র সামনে বসা দরকার। তখন আল্লাহ’র কাছে চাও- হে আল্লাহ্! আমি এমন চিন্তা করেছি, আর ফায়সালা এমন হয়েছে। হে আল্লাহ্! এর মধ্যে খায়ের দিয়ে দাও ।
আমি রিসালাতের যুগের কথা বলছি। তখনও যদি কোন মাশোয়ারা ইনফেরাদিভাবে হতো তবে ইখতেলাফ হতো। খেলাফতের যুগেও যখনি মাশোয়ারা ইনফেরাদি হয়েছে তখনই ইখতেলাফ সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ্য করুন! মাশোয়ারা এমনি এক ইজতেমায়ি আমল, যে যুগেই তা ইজতেমায়ি হয়নি সে যুগেই তা সাথিদের মধ্যে ইখতেলাফ পয়দা করেছে। এক জমিনের মাসায়ালা ছিল। দুই ব্যক্তি হজরত আবু বকর (রা:) এর খেদমতে এসে বলল, হে খলিফা! অমুক এলাকায় কিছু জমিন অনাবাদি পড়ে আছে। এটি চাষাবাদের উপযুক্ত ও না। তাই বেকার পড়ে আছে। চাষাবাদ করা হচ্ছে না। যদি আপনি ঐ জমি আমাদের বন্দোবস্ত করে দেন তা হলে আমরা জমিগুলো চাষাবাদের উপযোগী করে নিব। এতে জনগনেরও লাভ হবে, দেশেরও লাভ হবে। আবু বকর (রা:) ঐ সময়ে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের সাথে পরামর্শ করলেন যে, ভাই তোমাদের কি রায়, কি রায়, কি রায়? যেমন আমাদের কাছে যখন কোন মাসায়েল আসে তখন যারা উপস্থিত থাকে তাদের সাথে মাশোয়ারা করে নেই। যে উপস্থিত নেই তার সাথে মাশোয়ারা করি না। তার রায় পরে আসে। তখন ঝগড়া হয়। সমস্ত এখতেলাফের কারণ এটিই যে, সাথিদের থেকে রায় নেওয়া হয় নাই আর তায় হয়ে গেছে। যা হোক, আবু বকর রাঃ উপস্থিত সাথিদের সাথে মাশোয়ারা করে নিলেন এবং জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ফায়সালা করলেন। জমি তাদের দিয়ে দেওয়া হলো। দলিল তৈরি করা হলো। মহর লাগিয়ে দেওয়া হলো। এরপর আবু বকর রাঃ বললেন জমি তোমাদের হয়ে গেছে। তোমরা জমি নিয়ে নাও। তবে এর মধ্যে হযরত উমর (রা:) কে সাক্ষী করে নিও। অনেক ধ্যানের সাথে এই ঘটনা শোনো। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনাকে সামনে রেখে আমি ও আপনি আমাদের মাশোয়ারা কে চিন্তা করি। তালহা (রা:) তাদের উকিল ছিলেন। তিনি চুক্তিপত্র লিখে সীলমোহর মেরে হজরত উমর রাঃ কাছে গেলেন। কাগজ পত্র ওমর (রা:) এর সামনে দিয়ে বললেন হজরত আবু বকর (রা:) বলেছেন জমির এই বন্দোবস্তনামায় আপনাকে সাক্ষী রাখতে চাই। হজরত ওমর (রা:) লোকটির পরিচয় জেনে বললেন এখন ইসলাম শক্তিশালী। আগে অমুসলিমদের ইসলামে আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হত। অমুসলিমদের সাহায্য সহযোগিতা করা হতো। এখন এগুলোর প্রয়োজন নেই। এ বলে তিনি থু থু দিয়ে আবু বকর (রা:) এর সাক্ষর ও মোহর মুছে দিলেন। এমনকি কাগজটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলেন। হযরত ওমর (রা:) আরও বললেন যদি তুমি এই জমি নেওয়ার জন্য আল্লাহ’র কাছে সাহায্যও চাও, আল্লাহ’ তায়ালা তোমাকে সাহায্য করবেন না। আমি এই জমি তোমাকে দিব না। হযরত তালহা (রা:) হযরত আবু বকর (রা:) এর কাছে ফিরে এসে বললেন, আমীর কে? আপনি না ওমর? এটি মামুলি প্রশ্ন না। যিনি খলিফায়ে আউয়াল, যাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খলিফা বানিয়ে গেছেন; তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে খলিফা আপনাদের দুই জনের মধ্যে কে? আপনি না-কি ওমর? আল্লাহু আকবার! পরস্পরের মহবক্ষত, একে অন্যের মেজাজ বুঝা ও সাথির রায়ের ইহতেরাম সাথির রায়ের আদব কি হতে পারে? দেখো, হযরত আবু বকর (রা:) বললেন আমীর ওমর। এটি বলেন নি আমি আমীর। আমি লিখে দিয়েছি। আমার লেখা কাগজ ছিঁড়ে ফেলল? আমি খোলাখুলি বলছি-দেখুন! এক সপ্তাহের জন্য ফায়সাল হয়ে আমরা মনে করি, আমিই সবকিছু। এক সপ্তাহের ফায়সাল আর ওখানে হযরত আবু বকর (রা:) উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি। আল্লাহর নবীর বানানো আমীর। কত সুন্দরভাবে হযরত ওমর (রা:) এর বিষয়টি মেনে নিলেন। বললেন, আমীর তো উমর, কিন্তু কথা আমার মানতে হবে। চিন্তা করুন, যে ব্যক্তির ইমারত ও এতেয়াত উভয়টি আছে এমন ব্যক্তি কী করে বলে যে, আমীর ওমর, ইমারাত তার, আর এতায়াত আমার করতে হবে। হযরত তালহা (রা) বলেন- আমি বুঝতে পারছি না যে, আমি কার কাছে যাব? একদিকে ইমারাত অন্যদিকে এতায়াত। কাজ করনেওয়ালাদের মাঝে আপোষে এমন ইত্তেফাক থাকলে আপোষে লড়াই করানেওয়ালারা রাস্তাই পাবে না। হযরত আবু বকর (রা:) এই হেকমত অবলম্বন করেছিলেন। বলেছিলেন, ওমরের রায় উত্তম। যদি আবু বকর (রা:) এমন কথা না বলতেন তবে নাউজুবিল্লাহ! এক তবকা তৈরি হয়ে যেত ওমরের খেলাফ। যে, আমি এটি করব। আমি আমীর সাহেব থেকে তায় করে নিয়েছি। হযরত আবু বকর (রা:) বলেছিলেন, ওমর আমীর কিন্তু আমার কথা মানতে হবে। এমন বলেন নি, আমি আমীর আমার কথা শুনতে হবে। হযরত তালহা এই কথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন। সাথিদের মথ্যে আপোষে এমন ইত্তেফাক ছিল যে, হযরত আবু বকর (রা:) হযরত ওমরের রায় হতে বুঝে নিয়ে ছিলেন যে, হযরত ওমর (রা:) এর রায় উত্তম। কিছুক্ষণ পর হযরত ওমর (রা:) রাগান্বিত মেজাজে এসে বললেন, হে আবু বকর! জমি কি আপনার ব্যক্তিগত ছিল যে, তাকে দিলেন? আবু বকর (রা:) বললেন, জমি সব মুসলমানের। আমার ব্যক্তিগত না। হযরত ওমর (রা:) বলেন হে আবু বকর (রা:) আপনি কেন সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করেন নি? এই কথা বলেননি যে, আমার রায় কেন নেন নি? আমাদের ঝগড়া তো এখানেই। তা-ই না? আমার থেকে কেন রায় নেয়া হলো না? আমার থেকে কেন রায় নেয়া হলো না? আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করা হলো না? কিন্তু হযরত ওমর (রা:) বলেন নি; যে, আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করা হলো না? হযরত আবু বকর (রা:) বললেন, হে উমর! আমি প্রথমেই বলেছি যে, তুমি ইমারতের সবচেয়ে বেশি যোগ্য। তুমি এই জিম্মাদারী গ্রহণ করে নাও। কিন্তু তুমি নাও নি। বরং আমার মাথায় এই বোঝা চাপিয়ে দিয়েছ। কি আজব কাহিনী? এই পুরো ঝগড়ার কারণ ছিল হযরত ওমর (রা:) মাশোয়ারায় ছিলেন না। আমি একিনের সাথে বলতে পারি, আমাদের কাজের ইন্তেসারের (বিশৃঙ্খলার) আসল কারণ হচ্ছে সাথিদের ইজতেমায়িয়াত ছাড়া ফায়সালা করা; রায় নেয়া চাড়া ফায়সালা করা। কেউ অসুস্থ হলে তাকে ছেড়ে দিয়ে মাশোয়ারা করবে না। বরং উমূর নিয়ে তার কাছে চলে যাও। কেননা সে আমাদের মাশোয়ারার সাথি। এক দেশের সাথিরা আমাদের কাছে এলো। বলল এক লোক বিশ বছর আগে আমাদের ওখানে শুরার সাথি ছিল। নিজামুদ্দিন শুরা বানিয়ে ছিল। উনাকে সেখানে রাখা হয়েছিল। এরপর সে বিদেশ চলে যায়। বিশ বছর সেখানে ছিল। এখন বিশ বছর পর আবার এসেছে। সে-কি আমাদের এই শুরায় শামিল হবে, মাশোয়ারায় থাকবে? আমি বললাম, হ্যাঁ। যেহেতু সে শুরার সাথি মৃত্যু পর্যন্ত। বিশ কেন, একশত বছর পর এলেও সে শুরায় শামিল হতে পাড়বে। সাহাবাদের মধ্যে যখন-ই কোনো বিরোধ দেখা দিয়েছে; দেখা গেছে, তার কারণ হলো তিনি মাশোয়ারায় উপস্থিত ছিলেন না। এর বহু ঘটনা আছে। কাজেই নিজেদের মাশোয়ারাকে ইজতেমায়ি বানাও। আমরা তায় করে নিই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় শুরার সব সাথিদের সামনে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ফায়সাল কবরব না। আমরা সবাই এটি তায় করে নিই। সাথে সাথে কোনো সাথির অন্তরেও এই কথা থাকা না চাই যে, আমার কাছে কেন রায় নেয়া হলো না। আমি আপনাদের সাথে অনেক জরুরী কথা বলছি। হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ:) বলেন জিম্মাদার রায় চাইলে তুমি রায় দিবে। নিজের রায় আল্লাহ কে সামনে রেখে পেশ করবে। কেননা, আল্লাহর কসম; প্রত্যেক রায় দেনেওয়ালার কাছে কিয়ামতের দিন তার রায় সম্বন্ধে প্রশ্ন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা করবেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি এই রায় কেন দিয়েছিলে? আমার আপানার নফসানিয়াত, আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ এর মধ্যে কতটুকু ছিল? তা কিয়ামতের দিন ফায়সালা হবে। দ্বিতীয়: কাজের জন্য রায় দিয়েই চুপ হয়ে যাও। রায়ের প্রতি কোনো ইসরার বা জোর চালানো যাবে না। কেননা, রায় দেনেওয়ালা আল্লাহর কাছে বড়। ইসরারকারী আল্লাহর কাছে অপরাধী। কোনো রায়ের প্রতি যে ইসরার করে, রায় বাস্তবায়নে যে চাপ প্রয়োগ করে সে মুজরিম (অপরাধী)। আমি আপনাদের এই সম্পর্কে একটি ঘটনা শোনাতে পারব। যে, ইসরারের দ্বারা ইজতেমায়িয়াত ভেঙ্গে যায়। আর ইজতেমায়িয়াত ভঙ্গকারী আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধী। রায় প্রদান আমার হক-এমনটি না ভাবা। কেননা, রায় প্রদান করা আমার হক বা অধিকার না। রায় প্রদান আমার অধিকার এটি হলো ইলেকশন। যেমন আমি বাংলাদেশে থাকি; ভোট দেয়া আমার হক বা অধিকার। কিন্তু রায় দেওয়া না আমার হক; না ফায়সালের হক। রায় দেয়া হলো কাজের হক। যেমন নামাযে ইমামের ভুল হলে লোকমা দেয়া হয়। এটি না ইমামের হক, না মুকতাদির হক। বরং লোকমা দেয়া হচ্ছে নামাযের হক। যাতে নামাজ ঠিক হয় এই জন্য ইমামকে লোকমা দেয়ার আগে অনেক চিন্তা করে লোকমা দিতে হবে। এমন না যে, আমি ভূল বললাম আর আমার ভুলের কারণে সবার নামাজ খারাপ হয়ে গেল। কারণ নামাজ ঠিক করার জন্য লোকমা দেয়া যায়। এতে নামাজ ঠিক হবে। নতুবা নামাজ ঠিক হবে না। অতত্রব রায় দেয়াকে নিজের হক মনে করা নবুওয়াত না বরং রাজনীতি। সব ঝগড়া এখানেই; রায়ের হক নিয়ে। সাথিরা বলে, আমি রায় দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু আমার রায়ের উপর ফায়সালা হয় না। তাই আমি সবর করি। আসলে এটি সবরের স্থানই না, এটি শোকরের স্থান। যে, হে আল্লাহ! তোমার শোকর; আমার রায়ের উপর ফায়সালা হয় নি। অনেক সময় সাথি বলে, আমি তিন বছর ধরে রায় দিচ্ছি। কত দিন পর্যন্ত সবর করব? আমি বলি, তুমি অহেতুক সবর করছ। এখানে সবরের মওকাই নেই। কেননা, সবর করা হয় নিজের হক নষ্ট হওয়ার উপর। এখানে হকই নেই। তাই সবর করবে কিসের উপর? আপনার জমি দখল করে নিয়েছে, আপনার দোকান লুটে নিয়েছে। এতে আপনার হক নষ্ট হয়েছে। এখানে আপনি সবর করতে পারেন। হুদায়বিয়ায় সময় হযরত ওমর (রা:) এর রায় ছিল উমরা করার পক্ষে। যে, আমাকে উমরা করতে হবে। আমি হকের উপর আছি। আল্লাহর মদদ হক। উমরা ইবাদাত। কিন্তু আল্লাহর হুকুম ছিল এর বিপরীত। হযরত ওমর (রা:) ইসরার করছিলেন উমরা করার জন্য। মুশরিকদের দাবি ছিল, মুসলমানদের কোনো দাবি রাখা যাবে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক আছে। হযরত উমর (রা:) বলেন, কেন? হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর হুকুম। যখন ওহি নাযিল হতে লাগল তখন হযরত ওমর (রা:) এই ভয়ে দূরে চলে যাচ্ছিলেন যে, হয়ত তার বিরুদ্ধে ওহি নাযিল হবে; হয়ত এখনই তার উপর আল্লাহর আযাব নাযিল হতে শুরু করবে। হযরত ওমর (রা:) বলেন, আমি সারা জীবন সদকা, নফল ইবাদাত এই জন্য করেছি যাতে আল্লাহ তায়ালা আমার ঐদিনের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। চিন্তু করুন, ইসরার কত মারাত্মক বিষয়? অথচ ইসরারও ইবাদাতের জন্য; উমরা করার জন্য। আর এটি বাইতুল্লাহ ছাড়া অন্য কোথাও সম্ভবও ছিল না। ওমর (রা:) এই উম্মতের মুলহিম ছিলেন। সহী কথা আল্লাহ তায়ালা উনার অন্তরে ঢালতেন। পর্দা নাজিল করিয়েছেন, মদ নিষিদ্ধ করিয়েছেন। এমন ২০ টিরও বেশি হুকুম ওমর (রা:)-এর ইচ্ছার উপর নাযিল হয়েছে। তারপরও হযরত ওমর (রা:) যখন পরামর্শ সভায় বসতেন তখন বলতেন, انى واحد كاحدكم আমি তোমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। তোমরা রায় দাও কি করতে হবে? এমন না যে, আমার জানা আছে কি করতে হবে। আমি আবার আরজ করছি, মাশোয়ারাকে ইজতেমায়ি বানাও। সাথিরা একা একা যে উমূর নিয়ে আসে কোনো ফায়সালের হক নেই যে, সাথিদের থেকে রায় নেওয়া ছাড়া এসবের কোনো জবাব দেয়। তাই সাথিদের থেকে রায় নিয়ে ফায়সালা করো। চার কাজ এমন আছে যেগুলো ইজতেমায়িয়াতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে নবী! আপনার সাথিরা আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে। এগুলো হলো, এক. বিনয় অবলম্বন করবেন। দুই. সহনশীল হবেন। তিন. তাদের জন্য ইস্তেগফার করবেন। চার. তাদের সাথে মাশোয়ারা করবেন। এই চার কাজ আল্লাহ পাক কুরআনে পাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে করার জন্য হুকুম করেছেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এমন বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখ, যা আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়। এই আবেদন আমার সবার কাছে। কি সেই প্রতিবন্ধক? তা হলো, কারো কাছ থেকে খেদমত নেয়া। যদি কোনো শিক্ষক মনে করেন যে, তার ইলম দ্বারা দুনিয়ার মানুষ উপকৃত হোক হতবে তার জন্য প্রথম শর্ত হলো, সে যেন তার কোনো ছাত্রের খেদমত গ্রহণ না করে। হযরত হাফস (রহ:)-এর কেরাত সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার কারণ হলো, তিনি কখনও নিজের কোনো ছাত্রের কাছ থেকে খেদমত নেন নি। খেদমত নেয়াই আমাদেরকে আল্লাহ থেকে অনেক অনেক দূর করে দিয়েছে। হযরত হাফস (রহ:) একবার কুয়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। এক ছাত্র তাকে কুয়া থেকে উঠানোর জন্য রশি ফেলল। হযরত হাফস (রহ:) বলেন, আমি তোমার কাছ থেকে কখনও কোনো খেদমত গ্রহণ করি নি। আজও তোমার খেদমত গ্রহণ করব না। হ্যাঁ, তুমি যদি আমাকে কুয়া থেকে বের করে আনতে চাও তবে এমন কোনো ব্যক্তিকে ডাক যে আমার শাগরিদ না। ছাত্র দৌড়ে গেল। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করল, তুমি হাফস (রহ:)-এর কাছে পড়েছে? লোকটি বলল, না। বলল, এসো। জলদি এসো। তিনি কুয়ায় পড়ে গেছেন। কুয়া থেকে বের করে আনতে হবে। লোকটি যখন কুয়া থেকে তুলছিলেন তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি? বলল, আমি অমুক। তুমি কার কাছে পড়েছ? বলল, অমুক উস্তাদের কাছে। তিনি বললেন, না , না। তোমার দ্বারা হবে না। তুমি যার কাছে পড়েছ সে আমার শাগরিদ। তুমি অন্য কাউকে নিয়ে এসো। এরপর এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলো, যে অশিক্ষিত। তার মাধ্যমেই হযরত হাফস (রহ:)-কে কুয়া থেকে বের করে আনা হলো। হযরত আবু দারদা (রা:) ও হযরত সালমান ফারসি (রা:) এই দুই জনকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। হযরত আবু দারদা (রা:) চিঠি লিখলেন, হযরত সালমান ফারসি (রা:)-এর কাছে যে, আমি শুনেছি তুমি নাকি খাদেম রেখেছ। আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইরশাদ করতে শুনেছি যে, আল্লাহর সম্পর্ক বান্দার সাথে: বান্দার সম্পর্ক আল্লাহর সাথে ঐ সময় পর্যন্ত বাকি থাকবে যতক্ষণ সে অন্যের থেকে কোনো খেদমত নিবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, আমাদের নিজেদের মধ্যে তাকওয়া পয়দা করা জরুরী। তাকওয়া হলো, নির্জনে আল্লাহ কে ভয় করা। যে প্রকাশ্যে গুনাহ করে সে বেহায়া না। আজকাল মানুষ বুঝেই না। মনে করে যে, প্রকাশ্যে গুনাহ করে সে বে-হায়া। এই কথা একেবারেই ঠিক না। বে-হায়া সে, যে চুপিসারে গুনাহ করে। যে প্রকাশ্যে গুনাহ করে সে ইনসানই না। কারণ, প্রকাশ্যে গুনাহ করা জানোয়ারের কাজ। এজন্য গোপনে আল্লাহ কে লজ্জা করার নাম হায়া। সবচেয়ে বেশি লজ্জাশীল ছিলেন হযরত উসমান (রা:)। তিনি গোসলের সময়ও কাপড় খুলতেন না। বলতেন আল্লাহর কাছে লজ্জা লাগে। এই জন্য যখন কেউ থাকবে না, যখন কেউ দেখে না তখনও আল্লাহকে ভয় করো। কেননা আল্লাহ সব স্থানেই দেখতে পান। জুলেখা যখন ইউসুফ (আ:) এর সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করেছিল তখন মুর্তিগুলোকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখিছিল। হযরত ইউসুফ (আ:) বলেছিলেন, এ কি করছ ? জুলেখা বলল, আমার মাবুদ দেখছে। তাই তাদের ঢেকে দিচ্ছি। দেখুন! জুলেখা পাথরের তৈরি মাবুদকে লজ্জা পাচ্ছে। অথচ আমরা প্রকৃত মাবুদকে লজ্জা করি না।
খেদমত করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ। কিন্তু খেদমত নেয়া আল্লাহ থেকে দুরে থাকার কারণ। সাহাবায়ে কেরামের অভ্যাস ছিল উনারা লোকদের অকাতরে খেদমত করে যেতেন। কিন্তু কারো খেদমত নিতে চাইতেন না। আরেকটি বিষয় হলো, নিজেদেরকে মালের লালসা থেকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখবে যেমন একজন পাক-পবিত্র ব্যক্তি নিজেকে অপবিত্রতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। মনে রাখবেন, নবীদের পরীক্ষাও মালের দ্বারা হয়েছিল। যারা নবীওয়ালা কাজ করবে তাদের পরীক্ষা হবে মালের দ্বারা। বিলকিস হযরত সুলাইমান (আ:)-কে হাদিয়া পাঠিয়ে বলল যে,
فناظرة بما يرجع المرسلون
আমি পরখ করতে চাই, তিনি কি নবী, না একজন বাদশাহ? যদি বাদশাহ হয়ে থাকেন তাহলে আমার হাদিয়া গ্রহণ করবেন। যদি নবী হয়ে থাকেন আমার হাদিয়া ফিরিয়ে দিবেন। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আস্থা নষ্টকারী এবং পরষ্পর সম্পর্ক ছিন্নকারী জিনিস হচ্ছে মাল। মেহনতের জন্য ইস্তেগবালের জামানা খুবই বিপজ্জনক জামানা। উম্মত যখন মাল নিয়ে আসবে উম্মতকে বলে দাও আমাদের কাজ মাল জমা করা না। আমাদের কাজ হচ্ছে, মাল খরচের খাত চিনিয়ে দেয়া। ওখানে মাল খরচ করো। আমাদের মালের প্রয়োজন নেই। বাস্তবতা হচ্ছে এই, আমাদের সাথিরা চায় যে, লোকরা আমাদের কাছে পয়সা দান করুক। আমরা এগুলো মুসতাহিকদের উপর খরচ করি। আল্লাহর কসম! এই ফাঁদে কখনও পড় না। অন্যথায় কাজ করনেওয়ালাদের উপর থেকে উম্মতের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি আস্থা ও বিশ্বাস নষ্টকারী জিনিস হচ্ছে মাল। হাদিসের মধ্যে আছে, من حسب فقد هلك যার হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হবে। যদি কোনো এক ব্যক্তি কাজ করনেওয়ালাকে বলে, যে পয়সা দান করা হয়েছিল তা কোন খাতে ব্যয় করেছেন? তাহলে মনে করবেন যে, ঐ ব্যক্তির কাজ করনেওয়ালার প্রতি আস্তা নষ্ট হয়ে গেছে।
এক ব্যক্তি হযরত আশরাফ আলী থানভি (রহ:)-কে মাদরাসার জন্য কিছু মাল দিলেন। তিনি তা কবুল করে নিলেন। অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হযরত! আমি যে মাল দিয়েছিলাম তার রশিদ পেলাম না। তা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে ? হযরত থানভি (রহ:)- পুরো টাকা তাকে ফেরত দিয়ে বললেন তোমার আমার প্রতি আস্থা নেই। এই টাকা দিয়ে লাভ কি?
হযরত থানভী (রহ:) এর ওখানে মসজিদের হাউজ তৈরি হচ্ছিল। এক লোক দেরহামের খাম নিয়ে এসে পেশ করল। যে হযরত! আপনার এখানে মসজিদে কাজ হচ্ছে। আপনি এটি গ্রহণ করুন। তাতে আমিও হিস্যা পেয়ে যাই। সাথিরা বলল, হযরত কবুল করে নিল। আমাদের মাশোয়ারায় সাথিরা বলে না যে, হ্যাঁ। হ্যাঁ। কবুল করে নিন। হযরত কবুল করল। আমি আপনাদের সত্যি কথা বলছি, প্রথম সে আপনার উপর ইহসান করবে, পড়ে খরচ করবে তাবলীগের উপর। আপনি তখন তার ইহসানের কারনে আটকে যাবেন। কারন এটি উসুলি কথা মুহসিন ইহসান লেনে ওয়ালার উপর প্রভাব বিস্তার করেন। প্রথম আপনার উপর ইহসান করবে। তার পর বলবে এই গুলো মসজিদ মার্কাজের জন্য। তখন কী করবেন? সে তো আপনার হাত-পা বেঁধে নিয়েছে আপনার উপর ইহসান করে তখন আর কিছুই করা যাবে না।
এক ব্যাক্তি কাশ্মীর থেকে নিজামুদ্দিনে আমার কাছে কিছু মূল্যবান জিনিস নিয়ে এলো। সে বলতে লাগল, এগুলো মার্কাজের কাজে খরচ করুন। বললাম কেন? আপনাকে কে বলেছে, মার্কাজে টাকার প্রয়োজন আছে? সে বলছে, আমি চার মাস লাগিয়েছি। আমি আমেরিকা সফর করেছি জামাত নিয়ে। প্রতি বছর চার মাস সময় লাগানোর নিয়ত আছে। বছরের চিল্লা কখনো ছুটে না। আমি বললাম, আপনি এতদিন তাবলীগ করে এটিই বুঝেছেন যে, তাবলীগে লাগলে টাকা তাবলীগের কাজেই খরচ করবেন? এটি কেমন কথা-তাবলীগের মালদার সাথিরা শুধু তাবলীগেই টাকা খরচ করবে? কাজ করনেওয়ালাদের মধ্যে এতবড় ভুল বিরাজ করছে। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, আপনি কাশ্মীর থেকে নিজামুদ্দিনে আসার পথে আপনার মাল খরচের কোন খাত পান নাই আমাকে ছাড়া? আপনার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে, আপনার প্রতিবেশিদের মধ্যে, আপনার এলাকায়, আপনার জেলায় কোন উপযুক্ত ব্যক্তি নেই, যেখানে আপনি মাল খরচ করতে পারেন? লোকটি বলল, হ্যা আছে তবে.....। আমি বললাম এই পুরো টাকা ফেরত নিয়ে যান। এলাকায় গিয়ে এর উপযুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজে তাদের উপর খরচ করেন। আমাদের টাকার প্রয়োজন নেই। আমরা আপনার জানের মেহনত চাই। কেননা, শরিয়তের আহকাম জানের সাথে সম্পৃক্ত বেশি, উমূম এবং আম। যাকাত ও হজ্জ সবার উপর ফরজ না। নামাজ রোজা সবার উপর ফরজ। জানি ইবাদত আম। আমাদের কাজ জানি ইবাদত। আমরা কারো মালই গ্রহণ করি না। না নিজের জন্য, না অন্যদের জন্য। এই রাস্তা খরচ করার, কামানোর না। আমি খরচ করনেওয়ালা না। আমি আপনাকে খরচ করার রাস্তা চিনিয়ে দেনেওয়ালা। এরপর আপনি তাহকিক করে যাদের উপর খরচ করা দরকার তাদের উপর নিজে খরচ করুন। আমি এক পয়সার লেন-দেন করতে ইচ্ছুক না। কেননা কাজ করনেওয়ালার পরীক্ষা হয়ে থাকে মালের দ্বারা ।
আমি বলেছিলাম, বিলকিস হাদিয়া পাঠিয়ে দেখতে চাচ্ছিল যে, সুলাইমান (আ:) প্রকৃতপক্ষেই একজন নবী কিনা? না অন্যদের মতো একজন বাদশা।
إنى مرسلة إليهم بهدية فناظرة بم يرجع المرسلون
তিনি স্বর্ণের ইট পাঠিয়েছিলেন। হজরত সুলাইমান (আ:) ঐ হাদিয়া পৌছার পূর্বেই নিজ দরবারের ঘরবাড়ি, উঠান আঙ্গিনা, রাস্তা ঘাট সব কিছু স্বর্ণের বানিয়ে নিলেন। এই স্বর্ণের মাঠেই গরু, ছাগল বাঁধা হচ্ছিল। সেখানে এই সব জানোয়ার মল-মূত্র ত্যাগ করছিল। এই সব দ্বারা তিনি বিলকিসকে এটিই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, আমাদের সব কিছুই স্বর্ণের। তোমার একটি মাত্র ইট আমাদের কাছে কিছুই না। আল্লাহ হেকমত তাকেই দান করেন, যে মাল বিমুখ হয়ে থাকে। সুলাইমান (আ:) সব কিছু স্বর্ণের বানিয়ে রাস্তার পাশে একটি মাত্র ইট পরিমান জায়গা খালি রেখে দিলেন। এজন্য না যে, বিলকিসের এক ইট এখানে লাগিয়ে দেওয়া হবে। আমরা এমনটিই বুঝি যে, কেউ পয়সা দিলে অমুক কাজে ব্যয় করব। ঐ কাজে লাগাবো ইত্যাদি, ইত্যাদি। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ:) বলেন যে, কাজ করনেওয়ালা কাজের ক্ষেত্রে অন্যের মালের দিকে চেয়ে থাকে সে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য দরিদ্রতার দরজা খুলে দেয়। কেননা কাজ করনেওয়ালার দায়িত্ব হচ্ছে, সে আল্লাহর ভান্ডার থেকে নিজের জন্যও আনবে, অন্যের জন্যও আনবে। এক ইট বরাবর জায়গা খালি রাখার উদ্দেশ্য ছিল, বিলকিসের মালের প্রতি আকর্ষণকে অপমান করা। তাই যারা মাল নিয়ে আসে তাদের মালের ধ্যান ধারনাকে বেইজ্জত করো। মাল নিয়ে আগতদের ইস্তেকবাল করো না, স্বাগতম জানাইও না। যখন বিলকিসের দূত ঐ রাস্তা দিয়ে আসছিল তখন দেখল এক ইট পরিমান জায়গা খালি। সে ঐ নিয়ে আসা ইটটি সেখানে ফেলে দিল। এই ভেবে যে, হয়ত সুলাইমান (আ:) তাকে এই অপবাদ দিবে যে, সে ওখান থেকে ইট উঠিয়ে নিয়ে এসে তাকে হাদিয়া দিয়েছে। তাকে চোর ভাববে। চুরির অপবাদ থেকে মুক্তির জন্য ইটটি সেখানে ফেলে এলো। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের সবার মাল বিমুখ হওয়া খুবই জরুরি। হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ:) বলতেন, কাজ করনেওয়ালাদের হাজত লোকদের সামনে প্রকাশ পাওয়া লোকদের কাছে সওয়ালের নামান্তর। এই জন্য মালের ব্যাপার খুবই বিপজ্জনক। এই কারনে আমি চাই, আমাদের শুরাওয়ালারা যাতে কখনও এই ফাদে না পা না বাড়ায়। কেননা, হাদিসে আছে - যার হিসাব দিতে হবে সে হালাক হয়ে যাবে। এতে দুনিয়াতে আস্থা নষ্ট হবে আর আখিরাত বরবাদ হয়ে যাবে।
হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ:) বলেন, যে ব্যক্তি এই রাস্তায় দুনিয়া পেতে চাইবে, দুনিয়ার কোটি টাকা তার লাভ হতে পারে, কিন্তু তার আখেরাত বরবাদ হয়ে যাবে। কেননা হাদিসে এসেছে যে, এক ব্যক্তি তীর পাওয়ার জন্য আল্লাহ’র রাস্তায় বের হচ্ছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম বলেন, ঐ ব্যক্তির জন্য তীর ব্যতীত দুনিয়া ও আখেরাতে আর কিছুই নেই। দেখুন মুজাহিদ তীরের আশা করেছিলেন নিজ স্বার্থে না। আল্লাহ’র রাস্তায় জিহাদের জন্যই। তারপরও আল্লাহ’র রসুল বলেন, ঐ ব্যক্তি তীর ছাড়া আখেরাতে আর কিছুই পাবে না। এজন্য নিজেকে মালের ছোবল থেকে রক্ষা কর। এজন্য আমাদের এই মেহনতে চাঁদা, সওয়ালের কোন সুযোগই নেই। আল্লাহ’র তায়ালা ইস্তেগ্না (মালের প্রতি অনাসক্তি) দ্বারাই হাজত পুরা করবেন।
নিজেদের মধ্যে ইজতেমায়িয়াত পয়দা করো। ইজতেমায়িয়াত শুধু ইসারের দ্বারা পয়দা হয়। তুমি সাথিদের আগে বাড়াও। তাতে আল্লাহ তোমাকে এভাবে আগে নিয়ে যাবেন যে, কেউ কল্পনাও করতে পারবেনা যে, তুমি কিভাবে এত এগিয়ে গেছ? ইজতেমায়িয়াত এর সাথে প্রচুর বরকত আর ইফতেরাকের (বিভেদ) সাথে অগনিত অকল্যাণ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। কুরআনে দুই মসজিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এক. মসজিদে কুবা, দুই. মসজিদে দ্বারার। উভয়টি মসজিদ। মসজিদে কুবার বুনিয়াদ হলো তাকওয়ার উপর। তার মোকাবেলায় আরেকটি মসজিদ বানানো হলো যার নাম মসজিদে দ্বারার। কিছু সংখ্যক লোক পৃথক হয়ে আলাদাভাবে ঐ মসজিদ বানিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কাজ করনেওয়ালাদের মাঝে তাফরিক বা বিভাজন সৃষ্টি করা। আল্লাহ’র তায়ালা রসুল সাল্লাল্লাহি আলাহিসসালাম কে জানিয়ে দিলেন নবীজী আপনি ঐ মসজিদে কখনও যাবেন না। মোকাবেলায় ছিল মসজিদে কুবা। এই সম্পর্কে হুকুম احق ان تقوم فيه আপনি মসজিদে কুবায় জরুর যাবেন ।
لاتقم فيه ابدا আর মসজিদে দ্বারারে কখনো কদম রাখবেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম কিছু সংখ্যক সাহাবিকে নির্দেশ দিলেন, এই মসজিদটি আগুন দিয়ে জালিয়ে দাও। সাহাবারা মসজিদটি জ্বালিয়ে দিলেন। যারা এই মসজিদটি বানিয়েছিল তারা পালিয়ে গেল। জায়গাটা খালি পড়ে রইল।
আমি এই ঘটনা দ্বারা বুঝাতে চাই যে, নিজেদের মধ্যে তাফরিকের (বিভক্তির) কারনে কেমন অমঙ্গল দেখা দেয়? রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম জায়েদ ইবনে আসেম (রা:)-কে বললেন, জায়েদ! তোমার বাড়ি ঘরের জায়গা নেই। তুমি এখানে একটি ঘর বানিয়ে নাও। জায়েদ (রা:) বললেন, যেখানে আল্লাহ আপনাকে কদম না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে আমি কিভাবে ঘর বানাই? আমি এই জায়গা চাই না। তাছাড়া আমার অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। হ্যাঁ আরেকজন সাহাবি আছে যার থাকার জায়গা নেই, আপনি তাকে এই জায়গাটা দিয়ে দিতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালাম ঐ সাহাবিকে জায়গাটি দিয়ে দিলেন। ঐ জায়গায় ঘর বানানেওয়ালা পরে বলেন, আমি ঐ জায়গা ছেড়ে পরে অন্যত্র ঘর বানিয়েছি। কিন্তু যতদিন আমি ঐখানে ছিলাম ততদিন আমার কোন সন্তান হয় নাই। আমি সেখানে ডিমের উপর মুরগি বসাতাম বাচ্চা ফুটানোর জন্য কিন্তু কখনো বাচ্চা ফুটত না। কোন কবুতর আমাদের ঘরে বাসা বাঁধত না। ঐ জায়গা ছিল আমাদের জন্য অকল্যাণ। মানুষ এবং জানোয়ার সবারই প্রজনন ধারা ওখানে খতম হয়ে গিয়েছিল।
মেরে পেয়ারে দোস্ত, আজিজো!
নিজেদের মধ্যে ইজতেমায়িয়াতের আসবাব পয়দা করো। আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে কুরবানির মাধ্যমে কবুল করাও। করব ভাই, ইনশাআল্লাহ্ ? আল্লাহতায়ালা আমাকেও তৌফিক দান করুন। আল্লাহ্ তায়ালা সবাইকে তৌফিক দান করুন ।
--------------------------------------------------
রবিবার; মাগরিব বাদ: মাশোয়ারার কামরা
১ রবিউস সানি ১৪৩৫ হি.; ২০ মাঘ ১৪২০ বাংলা
০২.০২.২০১৪ ইংরেজি